মামুনুল হকের '৫০১' উদযাপন ঘোষণা: বিজয় নাকি লজ্জা?
মামুনুল হকের '৫০১' উদযাপন: বিজয় নাকি লজ্জা?

২০২১ সালের ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও রয়েল রিসোর্টের ‘৫০১ নম্বর’ কক্ষে এক নারীসহ অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে ‘বিজয়ের প্রতীক’ হিসেবে উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তার মতে, এটি কোনও নেতিবাচক বিষয় নয়, বরং এটি ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের’ পরাজয়ের দলিল। যেখানে এই প্রসঙ্গ উত্থাপিত হবে, সেখানে ‘৫০১’-এর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

সুশীল সমাজ ও রাজনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়া

মামুনুল হকের এমন ঘোষণার পর এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্রই চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, মামুনুল হকের ওই ঘটনা এমনিতেই তার জীবনের ‘কালো অধ্যায়’। সেই ঘটনা একান্তই তার ব্যক্তিগত। এটির সঙ্গে বিপ্লব বা দেশের প্রতি ত্যাগের কোনও সম্পর্ক নেই। এমন ঘটনা উদযাপনের ঘোষণা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

রাজনীতিবিদদের মতে, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড উদযাপন কোনোভাবেই সমীচীন নয়। বরং এটি নিয়ে আলোচনা করাটাও বিব্রতকর। এমন ঘটনা নরমালাইজ করলে সমাজে এর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘৫০১’ ছিল ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনার ব্যর্থ প্রজেক্ট’

নারায়ণগঞ্জের সেই ঘটনাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় নানানভাবে ব্যাখ্যা করলেও এবার নতুন করে ওই ঘটনাকে ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনার ব্যর্থ প্রজেক্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মাওলানা মামুনুল হক। তার দাবি, ওই ঘটনার মাধ্যমে তাকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

মামুনুল হক জানান, ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল তিনি তার স্ত্রী জান্নাত আরাকে (ঝর্ণা) নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছিলেন। তার দাবি, সে সময় পুলিশের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মী, সাংবাদিক ও অন্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাকে ও তার স্ত্রীকে হেনস্তা করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি দাবি করেন, তাকে এবং তার স্ত্রীকে নানান উপায়ে হেনস্তা করা হয়। পরিস্থিতি থেকে স্ত্রীকে রক্ষা করতে তাকে ওয়াশরুমে রাখেন। পরে নারী পুলিশ সদস্য এসে ওয়াশরুমে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকেও লাইভ সম্প্রচার চালান।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আরও দাবি করেন, রিসোর্টের বাইরে তখন হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। তিনি তাদের শান্ত করেন এবং পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, তার ফেসবুক আইডির লাইভ সুবিধা প্রযুক্তিগতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

জান্নাত আরার সঙ্গে বিয়ে প্রসঙ্গ

জান্নাত আরার সঙ্গে বিয়ে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জান্নাত আরা আগে তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হাফেজ শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন। তাদের দুটি সন্তান রয়েছে। পরবর্তীকালে পারস্পরিক সম্মতিতে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। বিবাহ বিচ্ছেদের পর জান্নাত আরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং একপর্যায়ে তিনি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তবে তিনি আগে থেকেই জানিয়ে দেন যে, ইসলাম অনুযায়ী একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা রক্ষার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। এরপর জান্নাত আরা সম্মতি দিলে শরিয়ত অনুযায়ী তাদের বিয়ে হয়।

বিয়ে গোপন রাখার কারণ হিসেবে মামুনুল হক বলেন, উপমহাদেশে একাধিক বিয়ে সামাজিকভাবে জটিল বিষয়। তাই প্রথম পরিবারে অস্থিরতা তৈরি করতে চাননি। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় আইনে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টিও জটিলতা সৃষ্টি করেছিল। তার দাবি, ইসলামে কাবিন বাধ্যতামূলক নয় এবং তার প্রথম বিয়েতেও কাবিন হয়নি। তবে তার একাধিক বিয়ের বিষয়টি ঘনিষ্ঠজনেরা জানতেন বলে তিনি দাবি করেন।

রিসোর্টে অন্য নাম ব্যবহারের বিষয়ে যা বলেন মামুনুল হক

মাওলানা মামুনুল হক জানান, তার পরিচয়পত্রে প্রথম স্ত্রী আমিনা তাইয়েবার নাম ছিল। অন্যদিকে জান্নাত আরার পরিচয়পত্রে তার সাবেক স্বামী শহিদুল ইসলামের নাম ছিল। এ কারণে তারা আলোচনার ভিত্তিতে প্রথম স্ত্রীর নাম ব্যবহার করেছিলেন।

ঘটনার দিন প্রথম স্ত্রীকে ফোনে ‘শহিদুল ইসলামের স্ত্রী’ বলে পরিচয় দেওয়ার বিষয়েও ব্যাখ্যা দেন মামুনুল হক। তার ভাষ্য, প্রথম স্ত্রী আগে থেকেই জান্নাত আরাকে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী হিসেবে চিনতেন। তাই বিষয়টি শান্তভাবে উপস্থাপনের জন্য তিনি সেই পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।

‘৫০১’ উদযাপন বা আনন্দের নয়, বরং ‘লজ্জা ও অপমানের’

মাওলানা মামুনুল হকের ‘৫০১’ এর সঙ্গে বিপ্লব বা দেশের প্রতি ত্যাগের কোনও সম্পর্ক নেই। বরং এটি একটি ‘লজ্জা ও অপমানের’ বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। ‘৫০১’ উদযাপনের বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘‘৫০১’-কে উনি সেলিব্রেট করবেন কেন? এটা আমার কাছে ক্লিয়ার না। ৫০১ এর বার্তাটা কী? ৫০১ এর বার্তা নিজের গোপনে বিয়ে করা স্ত্রীকে নিয়ে নিজের প্রথম স্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারপর তাকে নিয়ে রিসোর্টে ধরা পড়া, এটাই ৫০১ এর বার্তা।’’

তিনি বলেন, ‘‘ওনার মতো একজন বুজুর্গ আলেম, উনি এই ধরনের কথা বলবেন; এটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় নাই। উনি একজন আলেম, ইসলামের একদম ধর্যাধারী ব্যক্তি, আমরা ওনার কাছ থেকে ইসলামের ব্যাখ্যা শুনতে চাই, উনি একটা মাদ্রাসার শিক্ষক। হাজার হাজার ছাত্র ওনার হাত দিয়ে বেরিয়ে গেছে, আগামীতেও যাবে। তাদের কাছে উনি কী শিক্ষা দিলেন?’’

মাসুদ কামাল বলেন, ‘‘উনি (মামুনুল হক) বললেন, প্রথম স্ত্রীকে গোপন করে লুকিয়ে আরেকটা বিয়ে করা যায় এবং সেই লুকানোর বিষয়টি দুই বছর পরে ধরা না পড়লে কখনই বলতেন না। ধরা পড়ে বললেন, এটা ইসলাম অনুমোদন করে। এই কথাটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, স্ক্যান্ডাল হয়েছে, অনেক কিছু হয়েছে। উনি অনেকদিন জেল খেটেছেন। এতদিন পরে হঠাৎ করে ওনার নিজে থেকে কথাগুলো বলার দরকারটা কী ছিল?’’

মামুনুল হকের উদ্দেশে মাসুদ কামাল আরও বলেন, ‘‘মানুষের জীবনে ভুল হয়, পাপও হয়। এজন্য আল্লাহর কাছে তওবা করেন। আপনি তা না করে এটা নিয়ে আরও বেশি অ্যারোগেন্ট হয়ে যাচ্ছেন। আপনি আরও বেশি আক্রমণাত্মক হচ্ছেন। এটা তো ঠিক না। আপনি যতই যুক্তি দেন, যত কথাই বলেন, আপনি তো আমাকেই বুঝাতে পারলেন না, মানুষকে বোঝাবেন কীভাবে?’’

রাজনৈতিক ভাষ্যকার মাসুদ কামাল বলেন, ‘‘৫০১ কোনও সুন্দর বা কোনও আনন্দের বিষয় নয়, ৫০১ একটা লজ্জার বিষয়। ৫০১ একটা অপমানের বিষয়। এটা নিয়ে আপনি যত আলোচনা করবেন, এটা আপনার সম্মান বাড়াবে না। আপনার সম্মান না বাড়ালেও আমার কোন দুঃখ ছিল না। আমার দুঃখ, এটা নিয়ে আপনি যেসব যুক্তি দিচ্ছেন, ধর্মের যেসব কথা বলছেন, এতে আপনি ইসলামকে অনেকের কাছে বিতর্কিত করে তুলতেছেন।’’

সরকার দলীয় ও বিপ্লবী নেতাদের প্রতিক্রিয়া

সরকার দলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এটা আসলে একটা বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। ওনার ব্যক্তিগত ইস্যুকে এভাবে বিজয়ের সঙ্গে মেশানো খুবই দৃষ্টিকটূ। উনি তো ওখানে গিয়েছেন বউ বা গার্লফ্রেন্ড যাই হোক, তার সঙ্গে একান্ত সময় কাটাতে। সে সময়টা শহীদদের রক্তে রাজপথ ভেজা। এখন ওরকম একটা বিষয় যদি তিনি এভাবে উদযাপনের ঘোষণা দেন— তাহলে তো এটা সমাজে নিঃসন্দেহে একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’’

মামুনুল হকের এমন ঘোষণা সামাজিক মূল্যবোধকে বিঘ্নিত করবে বলে মন্তব্য করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, ‘‘ওনার মতো একজন রাজনীতিবিদ এবং ধর্মীয় নেতার বিতর্কিত কথাবার্তা বা কর্মকাণ্ডের ফলে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ মানুষ কিন্তু রাজনীতিবিদ বা ধর্মীয় নেতাদের দিকনির্দেশনা এমনকি জীবন-আদর্শ অনুসরণ করার চেষ্টা করে। সেক্ষেত্রে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ওনার জায়গা থেকে এটা উনি ঠিক করেননি।’’