ফেনীর বহিষ্কৃত যুবদল নেতা গাজী এনামুল হক ওরফে সুজন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় করা মামলার তিনি অন্যতম আসামি। তবে এরপরও ফেনী পৌরসভার একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। এ ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিলে ফেনী পৌর যুবদলের কমিটি বাতিল করে কেন্দ্রীয় যুবদল। বিলুপ্ত করা হয় পৌর যুবদল ঘোষিত ১২টি ওয়ার্ড কমিটিও। একই সঙ্গে পৌর যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দেওয়া হয় কারণ দর্শানোর নোটিশ।
বহিষ্কার ও কমিটি বাতিলের সিদ্ধান্ত
আজ রোববার দুপুরে কেন্দ্রীয় যুবদলের সহদপ্তর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা মামলার আসামি গাজী এনামুল হকের যুবদলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ স্থগিত করা হয় এবং দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তাঁকে।
বিতর্কিত কমিটি গঠন
দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ এপ্রিল রাতে ফেনী পৌর যুবদলের সভাপতি জাহিদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী রাসেল পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে ফেনী পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১২টি ওয়ার্ডের আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। এতে পৌর ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের ৮ সদস্যের কমিটিতে গাজী এনামুল হককে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
এনামুল হক বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি। এনামুলকে কমিটিতে পদ দেওয়া নিয়ে জেলাজুড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়। বিতর্কের জের ধরে কমিটি ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ২ মে রাতে ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের কমিটির ৬ জন সদস্য পদত্যাগ করেন।
কেন্দ্রীয় যুবদলের পদক্ষেপ
যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে আজ দুপুরে এক পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে ফেনী পৌর যুবদলের কমিটি স্থগিতের পাশাপাশি সব ওয়ার্ড কমিটিও বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ফেনী পৌর যুবদলের বিদ্যমান কমিটি স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ কমিটির কার্যক্রম স্থগিত থাকবে এবং গত ৩০ এপ্রিল ফেনী পৌর যুবদলের ঘোষিত ওয়ার্ড কমিটিগুলো বিলুপ্ত করা হলো।
অভিযুক্ত গাজী এনামুল হককে তথ্য গোপন করে দলের পদ গ্রহণ করায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, বহিষ্কৃতদের কোনো ধরনের অপকর্মের দায় দল নেবে না। যুবদলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের তাঁদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে ফেনী পৌর যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ফেনী পৌরসভার ঘোষিত ওয়ার্ড কমিটিতে ২০১৭ সালে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় করা মামলার আসামি এনামুল হককে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়েছে। এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করায় ফেনী পৌর যুবদলের সভাপতি এ কে এম জাহিদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী রাসেল পাটোয়ারীকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সামনে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।
বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া
অভিযুক্ত নেতার বক্তব্য
পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া এনামুল হক বলেন, ‘সদ্য ঘোষিত ওয়ার্ড কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি গাজী আবদুল কাদের আমার জ্যাঠাতো ভাই। তিনি এই কমিটির আমার পদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন। আমাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলছে। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় মামলাটি দায়ের করা হয়। ওই মামলায় আমাকে আসামি করা হয়। এ ঘটনায় দল থেকেও তখন প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। এখন আমাকে কমিটিতে পদ দেওয়ার পর পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। পুরো ঘটনা মূলত পারিবারিক প্রতিহিংসার ফল।’
সিনিয়র সহসভাপতির বক্তব্য
এনামুলের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষিত ওই কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি গাজী আবদুল কাদের বলেন, ‘এনামুল হক আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি শুধু নন, তাঁর পরিবারের সদস্যরাও ওই দলের রাজনীতিতে সক্রিয়। ২০২৪–এর ৫ আগস্টের পর এনামুল বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। কমিটিতে আমি সভাপতি পদপ্রত্যাশী ছিলাম। কিন্তু কমিটিতে এমন ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাঁরা খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ ধরনের ব্যক্তির নেতৃত্বে রাজনীতি করা সম্ভব নয় বলেই আমরা তাৎক্ষণিক পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।’
পৌর যুবদল সভাপতির বক্তব্য
কমিটিতে বিতর্কিত ব্যক্তিকে স্থান দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনী পৌর যুবদলের সভাপতি জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর শ্রমিক লীগ নেতা আবুল কাশেম মিলন বাদী হয়ে খালেদা জিয়ার ওপর হামলার অভিযোগে একটি মামলা করেন, যেখানে এনামুলকে আসামি করা হয়েছে। তখন এই বিষয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। বিষয়টি জেলা বিএনপি ও যুবদল অবগত আছে। ওয়ার্ড কমিটি ঘোষণা করার পর সদস্যদের পদত্যাগ ও বিতর্কের সৃষ্টি করা ঘটনাটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
ঘটনার পটভূমি
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে ২০১৭ সালে ফেনীর মহিপাল এলাকায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করেন তৎকালীন সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা। ওই ঘটনায় সাত বছর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যমুনা হাই ডিলাক্স পরিবহনের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মিলন বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর দায়ের করা মামলায় এজাহারভুক্ত ২৮ জন আসামির তালিকায় এনামুল হক সুজনের নাম ২৫ নম্বরে রয়েছে।



