গত ৩০ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শেষ দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয় পক্ষ থেকেই দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক অবস্থান পাওয়া গেল। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, শেষ দিনে বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য সবার নজর কেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ঐক্যের ডাক
প্রধানমন্ত্রীর ৫০ মিনিটের বক্তব্যের মূল সুর ছিল ঐক্যের। তিনি মোটাদাগে বিভাজন ভুলে যাওয়ার ডাক দিয়েছেন। বলেছেন, ‘এই সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।’ প্রধানমন্ত্রীর ঐক্য ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ডাক সব সময়ই প্রশংসনীয়, সংকটময় সময়ে এমন বক্তব্য দেশের মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনে।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য: বিশ্লেষণ
তবে এই অধিবেশনে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে একটা আলাদা বিশ্লেষণের জায়গা আছে। মোট ৩৩ মিনিটের বক্তব্যে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে ছিল রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন প্রসঙ্গ, বাহাত্তরের সংবিধান বিতর্ক, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের তাগাদা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্বতন্ত্র অবস্থানের ব্যাখ্যা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত প্রশ্ন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জঙ্গিবাদ–সম্পর্কিত সরকারের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা এবং একই সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি কেন বর্তমান রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়েছেন। বক্তব্যের পুরোটাই ছিল টান টান উত্তেজনায়, মাঝেমধ্যে রসিকতা করে সরকারি দলের চিফ হুইপের সময়ের অংশ ও প্রধানমন্ত্রীর সময়ের অংশ নিজের বক্তৃতার জন্য চেয়েছেন। কিন্তু সেই রসিকতার জেরে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিব্যক্তি বর্ণনায় অটল ছিলেন, ধারাবাহিক ছিলেন।
নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া
সংসদে এই বক্তব্যের পরপরই নেট দুনিয়ায় আলোচনা শুরু হয়ে যায়। নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের বিপক্ষে নিশ্চয়ই অনেক যুক্তি আছে। দলের প্রধান হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। তবে নেটিজেনদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আচরণ দেখে বোঝা গেল, খুব সম্ভবত এটিই এবারের অধিবেশনে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ‘বেস্ট ডেলিভারি’ ছিল। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের নেতারা বক্তব্য রাখাকালে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত বিষয় এড়িয়ে এতটা সাবলীলভাবে সরকারের সমালোচনা করে যেতে পারেননি। তাই সবার ধারণা, এখন হয়তো কার্যত বিরোধী দলের অন্যতম কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবেন নাহিদ ইসলাম।
নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক প্রস্তুতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সময়ে পাঠের সূত্রে নাহিদ ইসলামের ‘রাজনৈতিক গ্রুমিং’টা আমাদের কাছাকাছি সময়েই হয়েছে। বিগত সরকারের আমলেই মাহফুজ আলম, তাঁর বন্ধু ও অনুজদের বিভিন্ন পাঠচক্র আয়োজন করতে দেখেছি। একসঙ্গে চারটি পত্রিকাও চালিয়েছেন তাঁরা। লোকসংখ্যা বেশি ছিল না; অনেকের ভাবটা ছিল এমন যে ‘এত জ্ঞান কপচিয়ে কী হবে।’
আবার এর মধ্যেই প্রতিবছর নতুন নতুন শিক্ষার্থী এই যাত্রায় যুক্ত হয়েছেন। নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের আজ যে যে বিশ্লেষণই করুক না কেন, ব্যক্তিগত ধারণা থেকে আমি জানি, নাহিদ ইসলামের তৈরি হওয়া রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শনের সেসব তুমুল পাঠচক্র থেকেই। কারণ, দিন শেষে রাজনীতিবিদদের মধ্যে যাঁদের জানাশোনার একটা শক্ত ভিত্তি আছে, তার ছাপ স্বভাবতই ঠিক সময়ে স্পষ্ট হয়েই ওঠে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সংসদে কিংবা ঐকমত্য কমিশনে কিছু সময়ে অপ্রতিরোধ্য মনে হওয়ার কারণটাও একই।
ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ
খেয়াল রাখতে হবে, নাহিদ ইসলাম এই সময়েরই সন্তান। তিনি সংসদে আইনপ্রণেতা হিসেবে কাজ করলেও তিনি এখনো ছাত্রনেতাই। বরং এখনো ছাত্রসংগঠনগুলোয় নেতৃত্বস্থানে তাঁর চেয়ে অনেক বড়রা ছাত্ররাজনীতি করে যাচ্ছেন। তাই আমাদের স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকবে, বর্তমান ছাত্ররাজনীতিতে আমরা নাহিদ ইসলামদের মতো আরও অনেক ছাত্রনেতাকে বেড়ে উঠতে দেখব।
ছাত্রসংগঠনের চ্যালেঞ্জ
রাজনীতি সবার জন্য নয়। আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা সবচেয়ে বেশি পেশিশক্তি, অর্থশক্তি ও ক্যারিয়ারবিহীন ছাত্রদের গন্তব্য হলো ছাত্ররাজনীতি। কিন্তু ছাত্রসংগঠনগুলো যদি সত্যিকারভাবে রাজনৈতিক পাঠসম্পন্ন নেতৃত্ব তুলে আনতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশ কাদের নিয়ন্ত্রণে যাবে?
সরকারি দলের সঙ্গে সব সময় বুদ্ধিবৃত্তির একটা সরাসরি সংযোগ থাকে। দার্শনিক মিশেল ফুকো তাঁর ‘ক্ষমতা/জ্ঞান’ তত্ত্বের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ও জ্ঞান একে অপরের পরিপূরক এবং অবিচ্ছেদ্য। প্রতিটি সরকারের সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ কাজ করেছে, যারা ক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোও হয়তো চাইলেই তেমন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সাহায্য’ পাবে। তবে অর্গানিক জানাশোনাসহ রাজনীতিবিদ তৈরি না করতে পারলে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সাহায্য’ কখনোই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।
ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি
গত কয়েক সপ্তাহ ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল টানা সংঘর্ষে জড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসত্য তথ্য ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক একাডেমিক পরিস্থিতি নষ্ট হয়েছে। এখানে কার কতটুকু দোষ, তা পাশে রেখে বলতে হয়, বিদ্যমান প্রধান কোনো ছাত্রসংগঠনই কোয়ালিটিনির্ভর রাজনীতি করছে না। এর ফলে তারা একদিকে অর্গানিকভাবে রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে, অন্যদিকে ক্যাম্পাসে মেধাবীদের কাছে টানতে পারছে না। মূলধারার ছাত্রসংগঠনগুলোতেও আদতে রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন মেধাবীরা আছেন। কিন্তু যেসব রাজনৈতিক দল ‘পাওয়ার পলিটিকস’ করে থাকে, বহু কারণে সেসব দলে সাধারণত মেধাবীরা ওপরে উঠে আসতে পারেন না। তাঁদের কাজের ক্ষেত্রও থাকে সীমাবদ্ধ।
সরকারের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
দল ক্ষমতায় আসার পর সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে নিজের দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে সামলানো। কিন্তু তাদের ওপর দমন–পীড়নের সুযোগ না থাকায় এটিই আসলে নিজেদের কর্মীদের খারাপ সময়ে ও ভবিষ্যতে লড়াই করার জন্য তৈরি করার জন্য শ্রেষ্ঠ সময়।
নতুন রাজনৈতিক প্রজন্ম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে একটি গণ-অভ্যুত্থান, তারপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের সাক্ষী হয়েছি। এরই মধ্যে একটি রাজনৈতিক প্রজন্মের জন্ম হয়েছে। আমাদের সঙ্গেই বড় হওয়া অনেকে এখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছেন। কিন্তু এই প্রজন্মের বড় অংশটিই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে রয়ে গেছে, তারা এখনো মূলধারার দলগুলোর ওপর আস্থা আনতে পারেনি। এই নতুন রাজনৈতিক প্রজন্মের আমাদের নতুন ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ তৈরি করবে।
উপসংহার
তাই মূলধারার ছাত্ররাজনীতিতে এখন রাজনৈতিকভাবে মেধাবী ছাত্রদের প্রয়োজন। তাতে দল ও দেশ উভয়ের সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। শেষ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর কথায় যে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তার বাস্তবায়ন করতে হলে বিরোধী দলকে সে ঐক্যের ডাক গ্রহণ করতে হবে এবং তা গ্রহণ করার জন্য সরকারের কাজেও সেই আন্তরিকতার ধারাবাহিকতা দৃশ্যমান থাকতে হবে। বিরোধী দলকে কিংবা তার ছাত্রসংগঠনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়ন্ত্রণ করবেন না, তবে তাঁর নিজের দলের মধ্যেই তেজোদীপ্ত, নির্ভীক ও তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে তুলে আনতে হবে।
দেশের সবচেয়ে বড় অংশ—তরুণদের মন জয় করতে হলে মেধাবী ছাত্রনেতাদের জাতীয় রাজনীতিতে দ্রুত উঠিয়ে নিয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে, দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে, তরুণদের মানসপটে নেতৃত্বের চিত্রটা বদলে গেছে। সেই চাহিদা পূরণ করতে প্রয়োজন নতুন ধারার, রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন ‘ছাত্রদের পালস ধরতে পারা’ বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ নেতৃত্ব।



