রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাউকান্দি সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ ও নারী শিক্ষককে (প্রদর্শক) মারধর ও কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীরা নারী শিক্ষককে মারধর করে চুল ধরে বাইরে টেনে নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) কলেজের স্নাতক (ডিগ্রি) পরীক্ষার সময় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে হামলাকারীরা কলেজ প্রাঙ্গণে ঢুকে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা এই হামলার সঙ্গে জড়িত। কলেজের নারী শিক্ষক আলিয়া খাতুনকে (হীরা) স্যান্ডেল দিয়ে পেটানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। সমালোচনার মুখে বিএনপির এক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত
ভুক্তভোগী শিক্ষক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই স্থানীয় একটি চক্র এই কলেজ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল। বর্তমান অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় একটি চক্র তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। ঘটনার দিন দুপুরে 'সামাদ দারোগা' নামে পরিচিত সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আবদুস সামাদের নেতৃত্বে জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলী, ইউনিয়ন কৃষকদলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আফাজ উদ্দিন ও বিএনপি কর্মী শাহাদ আলীসহ ১০-১২ জন কলেজে প্রবেশ করেন। তারা মাহফিলের নামে অধ্যক্ষের কাছে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। অধ্যক্ষ টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তারা অশালীন ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষক আলেয়া খাতুন হীরা জানান, অধ্যক্ষ এই খাতে কলেজ থেকে টাকা দিতে পারবেন না জানালে তারা বলেন, 'টাকা দিতে পারবি না তো চেয়ারে কেন?'
নারী শিক্ষককে লাঞ্ছনা ও শারীরিক নির্যাতন
কলেজের শিক্ষক আলেয়া খাতুন হীরা জানান, বিএনপির কর্মীরা অধ্যক্ষের চেয়ার নিয়ে কটূক্তি করলে তিনি প্রতিবাদ জানান। এসময় বিএনপি কর্মী শাহাদ আলী ওই নারী শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। রাগের মাথায় শিক্ষক আলেয়া শাহাদকে একটি চড় মারলে শাহাদ পা থেকে স্যান্ডেল খুলে তাকে সবার সামনে পেটাতে শুরু করেন। শিক্ষকরা জানান, হামলাকারীরা আলেয়া খাতুনকে মারধর করে চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে কক্ষের বাইরে নিয়ে যায়। তার মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয় এবং প্রচণ্ড মারধরের কারণে তার একটি দাঁত ভেঙে গেছে ও আরও দুটি দাঁত নড়বড়ে হয়ে গেছে। তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এসময় শার্টের কলার ধরে অধ্যক্ষকেও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়, তাকেও প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।
অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি ও বিএনপির ব্যবস্থা
নারী শিক্ষককে স্যান্ডেলপেটা করার কথা স্বীকার করেছেন মাছ ব্যবসায়ী ও বিএনপি কর্মী শাহাদ আলী। তিনি বলেন, 'আমি কলেজের একটা পুকুর লিজ নিয়ে চাষ করি। এর টাকা দেওয়ার জন্য কলেজে গিয়েছিলাম। কলেজ গরম দেখে চলে আসতে চেয়েছিলাম। তখন আলেয়া আমার সঙ্গে তর্কে জড়ায় এবং থাপ্পড় দেয়। মেয়ে মানুষের হাতে থাপ্পড় খেয়ে নিজেকে সামলাতে না পেরে স্যান্ডেল খুলে আমি কয়েকটা দিয়েছি।' তবে শাহাদ আলী পরিকল্পনা করেই কলেজে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন শিক্ষক আলেয়া। তিনি বলেন, 'শাহাদ পুকুরের টাকা দেয় না। প্রভাব দেখালে টাকা আর কেউ চাইবে না— এজন্যই সে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। সবাই পরিকল্পনা করেই একসঙ্গে কলেজে এসেছিল। একটু সুস্থ হলেই আমি মামলা করবো— প্রস্তুতি নিচ্ছি।'
এদিকে ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার মুখে জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হলো। তবে মূল অভিযুক্ত শাহাদ আলীর বিষয়ে এখনও কোনও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
পরীক্ষা চলাকালীন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও এবং পুলিশের উপস্থিতিতে কীভাবে এই হামলা চললো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ শিক্ষকরা। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেনি। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকার জানিয়েছেন, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। অপরদিকে রাজশাহী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
মূল হোতা 'সামাদ দারোগা'
স্থানীয়রা জানান, কলেজের এই ঘটনার মূল হোতা আবদুস সামাদ। তিনি পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে চাকরিতে ঢুকেছিলেন। পরে পুলিশ পরিদর্শক হয়ে অবসর নেন। এলাকায় তিনি 'সামাদ দারোগা' নামে পরিচিত। এলাকায় মাতব্বর সেজে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা ঘটান তিনি। গ্রামে তিনি নিজের মতো করে 'আইন' চালু করেছেন। তার কারণে অতিষ্ঠ গ্রামের সাধারণ মানুষ। ২০২৪ সালে সামাদ দারোগা ও তার সহযোগীরা গ্রামে লিখিত নিয়ম চালু করেন যে, কারও বিয়েশাদি বা সন্তানের সুন্নতে খাতনায় সাউন্ডবক্সে গান বাজানো যাবে না। সোহানুর রহমান রুমন নামের এক যুবক বিয়ের দিনে বাড়িতে গানবাজনা করার কারণে ওই বছরের ২৭ নভেম্বর সালিশ ডেকেছিলেন সামাদ। এনিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সামাদকে ডেকে সতর্ক করেন। ফলে তিনি ওই সালিশ করতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, গতবছর ইসলামী জলসার নামে বিপুল টাকা চাঁদা তুলে সিংহভাগই আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এবারও বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে চাঁদা তুলছিলেন। এই চাঁদা না দেওয়ার কারণে সামাদ দারোগার সামনেই অধ্যক্ষ রাজ্জাক ও শিক্ষক আলেয়াকে মারধর করা হয়।



