রাজশাহীর দুর্গাপুর দাউকান্দি সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ ও নারী শিক্ষককে মারধর এবং অফিস ভাঙচুরের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) কলেজের স্নাতক (ডিগ্রি) পরীক্ষার সময় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিএনপির কিছু নেতা এ হামলার ঘটনা ঘটান বলে জানা গেছে। এদিকে হামলাকারীরা দাবি করেন, ইসলামি জলসার দাওয়াতপত্র দিয়ে গিয়ে তারাই হামলার শিকার হন।
এ ঘটনার কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কলেজের নারী শিক্ষক আলিয়া খাতুন ওরফে হীরা কয়েকজন বিএনপির নেতাকে শার্টের কলার ধরে টেনেহিঁচড়ে ফেলে দিচ্ছেন। অপর আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ব্যবসায়ীকে স্যান্ডেল দিয়ে পেটাচ্ছেন তিনি। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
হামলায় আহত হয়ে কলেজ অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর নারী শিক্ষক আলিয়া রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এদিকে, এ ঘটনায় দুর্গাপুর থানায় কোনও মামলা বা অভিযোগ হয়নি। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদীন ও দুর্গাপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ঘটনার বিবরণ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় ইসলামি জলসা আয়োজন উপলক্ষে সাবেক পুলিশ সদস্য আবদুস সামাদের নেতৃত্বে কয়েকজন বিএনপি নেতা কলেজে যান। তারা অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলার সময় আলিয়া খাতুন ভিডিও করছিলেন। তখন জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন শিক্ষক আলিয়া খাতুনের মোবাইল ফোন কেড়ে নিতে বলেন। আফাজ উদ্দিন নামে একজন তার ফোন কেড়ে নিতে যান। তখন আলিয়া তাকে থাপ্পড় মারেন। এ নিয়ে তর্কাতর্কি হয়। ফোন কেড়ে নেওয়ার পর আলিয়া খাতুন বাইরে এসে আফাজ উদ্দিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। এ সময় এজদার নামে একজনকেও থাপ্পড় মারেন।
এদিকে, একই সময়ে কলেজের পুকুরের ইজারাদার, মৎস্য ব্যবসায়ী ও বিএনপির কর্মী শাহাদ আলী অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে আসেন। তার বিরুদ্ধে কলেজের পুকুর ইজারা নিয়ে টাকা না দেওয়ার অভিযোগ আছে। শাহাদ আলীর সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে শাহাদ আলীকে থাপ্পড় মারেন আলিয়া খাতুন। তখন শাহাদ আলী পা থেকে স্যান্ডেল খুলে তাকে পেটাতে থাকেন। এই খবর পেয়ে শাহাদ আলীর ছেলে লিটন ও কর্মচারী মাহাবুর গিয়ে অধ্যক্ষ এবং আলিয়ার ওপরে হামলা চালান।
এ সময় কলেজের শিক্ষকেরা দুর্গাপুর থানা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পুলিশ সবাইকে বের করে দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। বেলা পৌনে ১টার দিকে কলেজ থেকে সবাই বেরিয়ে যান। বেলা ২টায় পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা শুরুর পরে বিএনপির ২০-২৫ জন নেতা-কর্মী কলেজের ভেতরে ঢোকেন। তারা কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ঢুকে অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক ও আলিয়া বেগমকে ব্যাপক মারধর করেন। কলেজের কার্যালয় ভাঙচুর করেন। অধ্যক্ষের কক্ষে সাজানো ক্রেস্টসহ অন্যান্য উপহারসামগ্রী ভেঙে ফেলেন। এরপর পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
বিবাদী পক্ষের বক্তব্য
এ ব্যাপারে শাহাদ আলী জানান, আওয়ামী লীগের আমলে তার ইজারার টাকাপয়সা পরিশোধ আছে। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সব এলোমেলো থাকার কারণে টাকা দেওয়া হয়নি। তিনি ওই টাকার হিসাব-নিকাশ করার জন্যই কলেজে এসেছিলেন। তার আগেই তাফসির মাহফিলের চিঠি দিতে যাওয়া লোকজনের সঙ্গে শিক্ষক আলিয়া খাতুন দুর্ব্যবহার করেছেন এবং একজনকে চড়ও দিয়েছেন। এই পরিস্থিতি মধ্যে তিনি অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে বলেন, ‘এই পরিস্থিতির মধ্যে কথা বলার পরিবেশ নেই। আমি না হয় পরে একদিন আসি।’
শাহাদ বলেন, ‘অধ্যক্ষ মহোদয় বিষয়টি আন্তরিকভাবে নিলেন কিন্তু পাশ থেকে আলিয়া বলে ওঠেন, “তুই ওদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস, তুই কিসের বিএনপি নেতা?” ’ শাহাদত আলী দাবি করেন, এ কথা বলার পরই আলিয়া তার গালে একটা থাপ্পড় মারেন। তখন তিনি পা থেকে স্যান্ডেল খুলে তাকে মেরেছেন। এরপর তিনি কলেজ থেকে চলে যান।
ইসলামি জলসা কমিটির আহ্বায়ক আব্দুস সামাদ বলেন, ‘জলসার দাওয়াতপত্র দেওয়ার জন্য আমরা অনুমতি নিয়ে অধ্যক্ষের অফিস কক্ষে প্রবেশ করি। এমন সময় শিক্ষিকা আলিয়া খাতুন আমাকে বলে, “আমার বাবার কলেজে তোরা কী করতে এসেছিস, বের হয়ে যা।” এ সময় এজদার কথা বললে তাকে কয়েকটি থাপ্পড় মেরে দেয়। একে একে তিন জনকে ওই শিক্ষিকা মারধর করে।’
অপর পক্ষে আলিয়া খাতুন হীরার দাবি, হামলাকারীরা অধ্যক্ষের ওপরে হামলা চালাচ্ছিল, অধ্যক্ষ স্যারের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় তিনি ভিডিও করছিলেন। তারা ভিডিও করতে দেবে না, এজন্য তার ওপরে হামলা করে স্যান্ডেল দিয়ে মারপিট করে এবং তার মোবাইল ফোনটা কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলে।’
এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমি ফেসবুকের মাধ্যমে দেখেছি। এ বিষয়ে আমাদের কেউ কোনও অভিযোগ দেননি। তারপরেও বিষয়টি জানার জন্য আমি অধ্যক্ষকে ফোন করেছিলাম, বন্ধ পেয়েছি।’
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজের সত্যতা খুঁজে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনও পক্ষ অভিযোগ করেনি।’
আহত ও হামলাকারীদের তালিকা
বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলায় আহতরা হলেন– কলেজ অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, নারী প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা, অধ্যাপক রেজাউল করিম আলমসহ কলেজের আরও দুই কর্মচারী।
আহত শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলী, জয়নগর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড ব্রহ্মপুর গ্রামের বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আফাজ আলী, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা ও মৎস্য ব্যবসায়ী শাহাদ আলী, জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আলী, ৪নং ওয়ার্ড দাওকান্দি বিএনপির সভাপতি এজদার আলী, জয়নগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি রুস্তম আলী, ছাত্রদল নেতা জামিনুর ইসলাম জয়সহ স্থানীয় ও ইউনিয়ন বিএনপি, অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন নেতাকর্মী হামলায় অংশ নেন।
অধ্যক্ষ ও শিক্ষিকার অভিযোগ
অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘তিনি সরকারি আদেশে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার কাছে বিভিন্ন সময় কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে আসছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তিনি তাদের ভালোভাবে চেনেন না বলেও জানান।
আলেয়া খাতুন হীরা অভিযোগ করে বলেন, ‘বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রায়ই কলেজে এসে হিসাব-নিকাশ চাইতো। আসলে তারা চাঁদার দাবিতে আসতো। অধ্যক্ষ মহোদয় নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন, তাই কোনও পক্ষকেই সেইভাবে গ্রহণ করতেন না। এটাই অপরাধ ছিল অধ্যক্ষের। আর একজন শিক্ষক বা সহকর্মী হিসেবে অধ্যক্ষকের পাশে থাকাটাই আমার অপরাধ। আমি এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা হয়েও কেন অধ্যক্ষ মহোদয়ের পক্ষ নিয়েছি এটাও আমার একটা অপরাধ।’
পুলিশের বক্তব্য
দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পরীক্ষা চলাকালে দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে কেন্দ্র হিসেবে ও আশেপাশের ১০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি ছিল। অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটতে পারে এমন সংবাদ পেয়ে কলেজে গিয়ে শিক্ষক ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় দফায় কথা বলে তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমিসহ আমার পুলিশ সদস্যরা বাধা দেওয়ার পরেও কিছু লোকজন কলেজে অনধিকার প্রবেশ করে হামলা-ভাঙচুর চালায়।’
বিএনপি নেতা বহিষ্কার
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি কলেজে ঢুকে ভাঙচুরসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির এক নারী শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় এক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার বেলা পৌনে ৩টায় বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কলেজটিতে ঢুকে ভাঙচুর ও একজন শিক্ষিকার সঙ্গে অশোভন আচরণের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীর বিরুদ্ধে। দলীয় নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলা পরিপন্থি কার্যকলাপে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে তাকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
কলেজটির অবস্থান দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নে। আর ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার। কলেজের স্নাতক (ডিগ্রি) পরীক্ষার সময় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে হামলাকারীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণে ঢুকে এই ঘটনা ঘটান। বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা এই হামলার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে।



