ট্রাম্পের ক্রিপ্টো আয়: ১৪০ কোটি ডলার
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার প্রথম বছরেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার আয় করেছেন। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে ট্রাম্পের আয় বেড়ে অন্তত ২২০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। অথচ ক্ষমতায় ফেরার আগে ২০২৪ সালে তাঁর ন্যূনতম আয় ছিল ৬২ কোটি ২০ লাখ ডলার।
কর আইনজীবী ও ‘অল দ্য প্রেসিডেন্টস মানি’ বইয়ের লেখক মেগান গোরম্যান বিষয়টিকে ‘সম্পূর্ণ নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি ২৫০ বছরের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সম্পদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন।
স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর ঐতিহ্য ভঙ্গ
গোরম্যান ও অন্যান্য ইতিহাসবিদ বলেন, সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা নিজেদের করপোরেট সংশ্লিষ্টতা থেকে দূরে রাখতেন। স্বার্থের সংঘাত এড়াতে তাঁরা সব সময় সচেতন থাকতেন। ইতিহাসবিদ লিন্ডসে এম চারভিনস্কি বলেন, ‘সরকারি পদ ছিল ঋণের উৎস, আয়ের নয়।’ তিনি মাউন্ট ভার্ননের জর্জ ওয়াশিংটন প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির নির্বাহী পরিচালক।
ট্রাম্পের অভিষেকের তিন দিন আগে তিনি ‘$TRUMP’ নামে একটি মিমকয়েন চালুর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। এটি এক বিশেষ ধরনের ক্রিপ্টো টোকেন। প্রকাশিত তথ্যমতে, এই ব্যবসা থেকে তিনি নতুন করে আরও ৬৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় করেছেন। এই আয়ের পরিমাণ ২০২৪ সালে সারা বিশ্বে তাঁর পরিচালিত অন্যান্য সব ব্যবসার মোট আয়ের চেয়েও সামান্য বেশি।
নতুন ব্যবসা ও সরকারি সিদ্ধান্তের প্রভাব
ট্রাম্প ও তাঁর পরিবার ঠিক তার উল্টোটা করেছেন। তাঁরা নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করেছেন। হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্পের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তে এসব ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত অক্টোবরে ট্রাম্প ক্রিপ্টোজগতের শীর্ষ ধনী চ্যাংপেং ঝাওকে ক্ষমা করে দেন। ঝাও হলেন বিশ্বখ্যাত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা। ট্রাম্প পরিবারের নিজস্ব ক্রিপ্টো ব্যবসার অন্যতম প্রধান অংশীদার এই বাইন্যান্স।
এ ছাড়া গত জুলাইয়ে ট্রাম্প ‘স্ট্যাবলকয়েন’ নামে একধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সিকে উৎসাহিত করতে একটি আইনে সই করেন। ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিজেদের ‘স্ট্যাবলকয়েন’ বাজারে আনার মাত্র চার মাস পরই তিনি এই আইনে সই করলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে নজিরবিহীন
মেগান গোরম্যান মনে করেন, ট্রাম্পের এই কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তির সঙ্গে একধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। কারণ, জর্জ ওয়াশিংটনের সময় থেকেই নীতিটি প্রচলিত যে—দেশের নেতারা নিজের স্বার্থের চেয়ে দেশকেই বড় করে দেখবেন।
হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্প পরিবার বারবার প্রেসিডেন্টের আয়সংক্রান্ত সব প্রশ্ন নাকচ করে দিয়েছে। তারা যুক্তি দিয়েছে, ট্রাম্পের দুই বড় ছেলে—এরিক ট্রাম্প ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনা করেন। ফলে এখানে স্বার্থের কোনো সংঘাত নেই।
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি মে মাসের শেষে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল মার্কিন জনগণের স্বার্থেই কাজ করেন।’ ডেল টেকনোলজিসের মতো কোম্পানিতে ট্রাম্পের পক্ষে শেয়ার কেনা নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তখন তিনি এই মন্তব্য করেন। কেলি আরও বলেন, ভুয়া সংবাদমাধ্যমগুলো বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প ও তাঁর ব্যবসার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছে। এসব অভিযোগ সত্য নয় বলেই জনগণ তাঁকে বিপুল ভোটে আবার নির্বাচিত করেছেন।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ
ট্রাম্পের নতুন আয়ের সিংহভাগই এসেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রাশিল্প থেকে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে, তখন তাঁর পরিবার এই খাতে আক্রমণাত্মকভাবে বিনিয়োগ শুরু করে। ট্রাম্প তাঁর পারিবারিক ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্স’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা। মঙ্গলবার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই ব্যবসা থেকে প্রেসিডেন্টের ৭৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার আয় হয়েছে। এই আয়ের একটি বড় অংশ এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছ থেকে। আমিরাত সরকার ওই কোম্পানির শেয়ার কিনেছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে বলা হয়, এ ধরনের টোকেনগুলো আর কমিশনের নজরদারির আওতায় থাকবে না। বাইডেন প্রশাসনের সময় সংস্থাটির চেয়ারম্যান যে অবস্থান নিয়েছিলেন, এ সিদ্ধান্ত ছিল তার ঠিক উল্টো। এই সিদ্ধান্তের ফলে ট্রাম্পের মিমকয়েন ব্যবসা সরাসরি লাভবান হয়।
সৌদি আরবের এক আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রিয়েল এস্টেট চুক্তি থেকেও ট্রাম্প ও তাঁর ছেলেরা কোটি কোটি ডলার আয় করেছেন। এই চুক্তির সঙ্গে সৌদি সরকারও জড়িত। এ ছাড়া ভিয়েতনাম ও রোমানিয়াতেও তাঁদের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা থেকে বড় অঙ্কের অর্থ এসেছে।
পরিবারের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ
তবে ট্রাম্পের এই আয়ের হিসাবে তাঁর ছেলেদের কিছু ব্যবসার মুনাফা ধরা হয়নি। তাঁর ছেলেরা সম্প্রতি সামরিক ঠিকাদারি ও ‘প্রেডিকশন মার্কেট’ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছেন। এ ছাড়া খনিজ সম্পদ উত্তোলনের খনি তৈরির জন্য তাঁরা কোটি কোটি ডলারের সরকারি সহায়তারও চেষ্টা করছেন। এসব খাত থেকে ট্রাম্প সরাসরি টাকা না পেলেও তাঁর পরিবার বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জন করছে।
২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন প্রথম মেয়াদে ওয়াশিংটনে আসেন, তখন তিনি ও তাঁর পরিবার নতুন কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবসা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউসে থাকার সুযোগ নিয়ে তাঁরা লাভবান হচ্ছেন—এমন অভিযোগ এড়াতেই এই চুক্তি করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। বিদেশি সরকারি প্রতিনিধিদের সফর এবং ট্রাম্পের হোটেল ও অন্যান্য স্থাপনায় লবিস্টদের খরচ করা নিয়ে এসব বিতর্ক তৈরি হয়।
দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্প পরিবার মুনাফা অর্জনের ব্যাপারে কোনো রাখঢাক রাখছে না। তারা অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ভিন্নতা
বিপরীতে আধুনিক সময়ের অধিকাংশ মার্কিন প্রেসিডেন্টই তাঁদের মালিকানাধীন ব্যবসা বা শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জর্জ ডব্লিউ বুশ নির্বাচনের আগেই টেক্সাস রেঞ্জার্স বেসবল দলের শেয়ার বিক্রি করেছিলেন। অন্যদিকে জিমি কার্টার তাঁর চীনাবাদাম খামারের দায়িত্ব একজন স্বতন্ত্র ট্রাস্টির হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কোনো প্রেসিডেন্টের নজির নেই। হোয়াইট হাউসে যাওয়ার ঠিক আগে নতুন ব্যবসায় নামা এবং মেয়াদে থাকাকালে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার উদাহরণ আগে আর দেখা যায়নি। বরং ইতিহাসবিদেরা সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর বিভিন্ন চেষ্টার উদাহরণ দিয়েছেন।
ঐতিহাসিক উদাহরণ
প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন জি হার্ডিং ক্ষমতায় থাকাকালে ওহাইওর একটি সংবাদপত্রের মালিক ছিলেন। এটি প্রায় চার দশক ধরে তাঁদের পারিবারিক মালিকানায় ছিল। তবে তাঁর বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ১৯২৩ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি পত্রিকাটি বিক্রি করতে রাজি হয়েছিলেন। এলবিজে ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও ইতিহাসবিদ মার্ক কে আপডেগ্রোভ বলেন, প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর যখন জনসন হোয়াইট হাউসে আসেন, তখন তাঁর স্ত্রী লেডি বার্ড জনসন নিজেদের রেডিও ও টেলিভিশন স্টেশনগুলো একটি ট্রাস্টের হাতে ছেড়ে দেন। বাইরের একজন আইনজীবী ও স্টেশন নির্বাহী সেই ট্রাস্ট নিয়ন্ত্রণ করতেন।
সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর প্রেসিডেন্সিয়াল হিস্ট্রির পরিচালক জেফরি এ অ্যাঙ্গেল বলেন, ‘প্রেসিডেন্টরা সব সময় তাঁদের সিদ্ধান্ত বা জনস্বার্থের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন বিষয় থেকে দূরে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস যেন ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে। তাঁরা মনে করেন, তাঁরা এত বেশি ব্যবসা করবেন যে মানুষ বিষয়টিকে আর অস্বাভাবিক ভাববে না।’
পরিবারের সদস্যদের ব্যবসা ও সমালোচনা
প্রেসিডেন্টদের সন্তান বা ভাইবোনেরা যখন ব্যবসায়িক চুক্তি করেছেন, তখন তা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। গত বছর ট্রাম্প সরাসরি যে পরিমাণ অর্থ আয় করেছেন, সেই তুলনায় আগের প্রেসিডেন্টদের স্বজনদের ব্যবসা ছিল খুবই ছোট। তা সত্ত্বেও সংবাদমাধ্যমে এসব নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনা হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে জিমি কার্টারের ভাইয়ের প্রবর্তিত ‘বিলি বিয়ার’ ব্র্যান্ডের কথা বলা যায়। এ ছাড়া ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের ছেলে জেমস রুজভেল্টের নামও আসে। জেমস একটি বিমা কোম্পানির আংশিক মালিক ছিলেন। তাঁর কোম্পানি বড় মার্কিন প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার কাছে বিমা পলিসি বিক্রি করত। অথচ তখন তিনি তাঁর বাবার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন। দ্য স্যাটারডে ইভিনিং পোস্ট এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জেমস রুজভেল্টের বিমা ব্যবসা নিয়ে বড় প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এটি ‘জিমিস গট ইট’ কেলেঙ্কারি নামে পরিচিতি পায়। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের ছেলেকে তাঁর সরকারি পদ ছাড়তে হয়েছিল।
ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান
ইতিহাসবিদেরা বলছেন, ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের বর্তমান কর্মকাণ্ড এই ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। স্বার্থের সংঘাত নিয়ে আগে যেমন সতর্কতা দেখা যেত, এখন তা আর নেই। এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো জ্যারেড কুশনার। তিনি তাঁর শ্বশুর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। অন্যদিকে তাঁর প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সার্বভৌম তহবিল থেকে কয়েক শ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। ইতিহাসবিদ আপডেগ্রোভ বলেন, তাঁরা যা করছেন তা অত্যন্ত খোলামেলা এবং বেপরোয়া। প্রায় গর্বের সঙ্গেই তাঁরা সরকারি পদ ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন। এটাই বর্তমান পরিস্থিতিকে আগের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ও নাটকীয় করে তুলেছে।



