গত ২৫ জুন রাতে ঢাকার তুরাগ নদ থেকে মো. সুমনের (১৭) অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সুমনের খালু মো. জুয়েল রানা জানান, সুমন ২২ এপ্রিল ছাত্রলীগের একটি মিছিলে গিয়েছিল। মিছিলটি কামারপাড়া থেকে রসুলপুর ঘাট পর্যন্ত যায়। পরে তারা একটি ট্রলার ভাড়া করে আশুলিয়া ঘাটের দিকে যায়। সেখানে পুলিশ তাদের ধরতে অভিযান চালায়। তখন সাত জনকে আটক করা হয় এবং বাকিরা নদীতে ঝাঁপ দেয়। সুমনও নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল বলে তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনের কাছ থেকে জানা গেছে।
পরিবারের বিবরণ
সুমনের খালু জুয়েল রানা বলেন, 'ঘটনার পর ২৩, ২৪ ও ২৫ জুন পর্যন্ত আমরা ট্রলার নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছি। কোথাও তাকে পাইনি। কোনও থানায় সন্ধান মেলেনি। ২৫ জুন রাত প্রায় ১২টার দিকে পুলিশ আমাদের ফোন করে জানায়, একটি সেতুর নিচে একটি মরদেহ পাওয়া গেছে। পরে গিয়ে আমরা সুমনের লাশ শনাক্ত করি।'
সুমনের পরিবার জানায়, তারা জানত না সুমন রাজনীতির সাথে জড়িত। সুমন কামারপাড়া আড়তে কাঁচামালের ব্যবসা করত এবং পড়াশোনা করত। তার ফেসবুক আইডি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছয় দিন আগে সর্বশেষ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রার ভিডিও আপলোড করা হয়েছে।
লাশ উদ্ধারের ঘটনা
উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, তাদের আওতাধীন এলাকায় ২২ জুন থেকে রবিবার পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে কোনও লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেনি। তবে ওই সময়ে তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে তিন জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরা হলেন- মো. সুমন (১৭), আরিফ হাসান রাকিব (২৫) ও রনি মোল্লা (৩৫)।
সুমনের লাশ ২৫ জুন রাতে সাভারের আশুলিয়া বাজার এলাকায় তুরাগে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শুক্রবার আশুলিয়া থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়।
পরিবারের অবস্থা
সুমনের বাবা মো. শাহ আলম, মা ও বোন দুই কক্ষের বাসায় বসে আছেন। ছেলেকে হারিয়ে বাবা-মা বাকরুদ্ধ। আত্মীয়-স্বজনরা কোনও কিছু জিজ্ঞেস না করতে অনুরোধ করেন। সুমনের মোবাইল থেকে সব ছবি ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে এবং বাসায় থাকা ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
জুয়েল রানা বলেন, 'সুমনের ওপরই পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল। সে একটি কাঁচামালের আড়তে কাজ করতো। সারারাত কাজ করতো, আবার পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছিল। আমরা এতটুকুই জানতাম, সে কাজ করে, পড়াশোনা করে। বন্ধু–বান্ধব থাকতে পারে। কিন্তু সে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, এটা আমরা কেউ জানতাম না।'
আরিফের মৃত্যু
একই ঘটনায় তুরাগ নদ থেকে ২৪ জুন আরিফ হাসান রাকিবের (২৫) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম বলেন, '২২ জুন বেলা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আরিফ। ওই দিন বিকাল ৪টার একটু আগে মোবাইলে মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিল। গত বুধবার তুরাগ নদ থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়। সে যে রাজনীতি (আওয়ামী লীগের) করতো আমরা জানতাম না। মৃত্যুর পর কয়েকজন ভিডিও-ছবি দেখানোর পর জানছি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা।'
আরিফের লাশ উদ্ধারের পরও মামলা করতে চাননি পরিবার, কিন্তু থানা পুলিশের নিয়মের কারণে অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়ি রংপুরে লাশ দাফন করা হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, 'আমরা স্থানীয়দের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ২৫ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া বাজারের পাশে তুরাগ নদের পাশের এক চক থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করি। পরে নিহত ব্যক্তির পরিবার মরদেহটি সুমনের বলে শনাক্ত করে। গতকাল এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির বড় ভাই অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন ২২ জুন পিকনিকের কথা বলে সুমন বাসা থেকে বের হয়। পরে তুরাগ নদে পড়ে যায়। সে সাঁতার জানতো না।'
ডিএমপির দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. দুলাল হোসেন বলেন, 'নৌ-পুলিশ গত বুধবার আরিফ নামে একজনের লাশ উদ্ধার করেছিল। এ ঘটনায় নিহতের চাচা অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।'



