প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বুধবার (১৭ জুন) মৌলভীবাজার জেলা সফরে আসছেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর এই সফরকে ঘিরে জেলা জুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে রাস্তাঘাট সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।
প্রস্তুতি ও কর্মতৎপরতা
মৌলভীবাজারে প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশকে সফল করতে মাঠে মঞ্চ ও প্যান্ডেল তৈরির ব্যাপক কর্মতৎপরতা চলছে। প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির স্থানীয় নেতারা নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ করছেন।
বিএনপি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে জেলাবাসীর মধ্যে নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। এতে নতুন করে পুরোনো দাবিগুলো আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে মৌলভীবাজারে একটি মেডিক্যাল কলেজ ও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, প্রবাসীবহুল ও পর্যটন এলাকা হিসেবে শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু, জেলার হাওরগুলোর উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণসহ নানা দাবি আলোচনায় এসেছে।
সফরসূচি
সফরসূচি অনুযায়ী, আজ সকাল ৯টায় তিনি নিজ বাসভবন থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হবেন। সকাল সাড়ে ৯টায় তিনি আকাশপথে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার উদ্দেশে রওনা হবেন।
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী দুপুর ১টায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে উপস্থিত হয়ে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে দুপুর ২টায় তিনি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার উদ্দেশে রওনা হবেন।
বিকেল ২টা ৩০ মিনিটে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।
পরে বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে দুসাই রিসোর্টের উদ্দেশে যাত্রা করবেন প্রধানমন্ত্রী। বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে সেখানে পৌঁছে সংক্ষিপ্ত বিরতি নেবেন। এরপর বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে দুসাই রিসোর্টে আয়োজিত রাজনৈতিক সভায় অংশ নেবেন।
রাজনৈতিক সভা শেষে বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। রাত ৮টা ৩০ মিনিটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করবেন এবং রাত ৯টা ২০ মিনিটে রাজধানীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ মো. উজ্জল হোসেনের সই করা সফরসূচিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি একটি সরকারি সফর এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তার সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন।
প্রস্তুতি ও দাবি
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, মাঠে যাওয়ার রাস্তা কোর্ট রোডের দুই পাশের ভ্রাম্যমাণ বিভিন্ন ধরনের দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাঠের সীমানাপ্রাচীরে রং করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ লাইনের প্রতিবন্ধকতা সরাতে গাছের ডালপালা কাটা হয়েছে। মাঠের ভেতরে প্যান্ডেলের স্থানে ইট ও বালু ফেলা হচ্ছে। চলছে প্যান্ডেল বাঁধার কাজ। সভাস্থল ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক তারেক খন্দকার বলেন, ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গল সফর করেছিলেন। তাঁর আগমনকে ঘিরে নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বসিত।
মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফয়জুল করিম বলেন, “আমরা ব্যাপক মানুষের সমাবেশ ঘটাব। সারা জেলার বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরব। বিমানবন্দর চালু, গ্যাস সংযোগ স্থাপন, মেডিকেল কলেজ স্থাপন—এ দাবিগুলোও তুলে ধরব।”
মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম নাসের রহমান বলেন, “এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের মৌলভীবাজার জেলায় বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র চার মাসের মধ্যে আসছেন। এটা সত্যিই প্রত্যাশার বাইরে। আমরা ভাবতেই পারিনি এত দ্রুত এই সফর হবে।”
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়, বরং জেলার উন্নয়ন পরিকল্পনা ও দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।
নাসের রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে তিনি যে উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মৌলভীবাজারে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন, শমসেরনগর বিমানবন্দর চালু এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তর—এই তিনটি দাবি এখন বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।’
তিনি আরও জানান, শমসেরনগর বিমানবন্দর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আগামী ২০ জুন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল সরেজমিনে পরিদর্শনে আসবে।
মেডিকেল কলেজ বিষয়ে তিনি বলেন, জেলা সদর হাসপাতালকে কেন্দ্র করেই একটি আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে এবং প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।
নাসের রহমান বলেন,‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুনজর রয়েছে। ইনশাআল্লাহ আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এসব প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। মৌলভীবাজার সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন একাডেমিক ভবন ও আবাসিক হল নির্মাণসহ পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের জনসভাস্থল পরিদর্শন শেষে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, বুধবার দেশে একযোগে ২০টি জায়গায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে। আগামী ১ জুলাই ৪০ লাখ ২০ হাজার ফ্যামিলি কার্ড ৩০০ নির্বাচনী এলাকার মধ্যে বিতরণ করা হবে। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সার্বজনীন কাজ। এখানে কোনো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভেদাভেদ নেই।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী আগামী বুধবার মৌলভীবাজার সফরকালে শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড এবং রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উপকারভোগীদের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করবেন। রাজনগরে ১৫৫ জন এবং শ্রীমঙ্গলে ১৫২ জন উপকারভোগী পরিবারকে তৃতীয় পর্যায়ের পাইলটিং কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিটি পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে আর্থিক সহায়তা পাবে।



