মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি, কুণাল ঘোষ ও মদন মিত্র সাধারণ সম্পাদক
মমতা নিজেই তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি, কুণাল-মদন সাধারণ সম্পাদক

ভারতের তৃণমূল কংগ্রেসের (একাংশ) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সভাপতির দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন দলীয় প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে তিনি রাজ্যে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দুই বিধায়ক কুণাল ঘোষ ও মদন মিত্রকে দিয়েছেন। এদিকে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের দুই মাসের মাথায় পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে এই প্রথম শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মমতা। পাশাপাশি তিনি শুভেন্দুকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘অত্যাচার করবেন না। মনে রাখবেন, এটা কিন্তু একদিন ফিরে আসতে পারে।’

চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগ

তৃণমূলের রাজ্য সভাপতির দায়িত্বে এত দিন ছিলেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তিনি রাজ্যের সাবেক তৃণমূল সরকারের অর্থমন্ত্রী। সভাপতির দায়িত্বের এক মাস যেতে না যেতেই দলীয় বিবাদ–বিভক্তির জেরে গতকাল শনিবার তিনি পদত্যাগ করেন। শুধু তা–ই নয়, তিনি দলের সব ধরনের পদ ছাড়েন।

তৃণমূলে বিভক্তি

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর তৃণমূল মূলত দুই ভাগ হয়ে গেছে। একভাগের নেতৃত্বে আছেন রাজ্যের সাবেক তৃণমূল সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা। অন্যভাগে আছেন বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ঋতব্রত অংশের তৃণমূলের সভাপতি অরূপ রায়। তৃণমূলে বিদ্রোহের জেরে গত ৩ জুন রাজ্য সভাপতি পদে চন্দ্রিমাকে বসান মমতা। এখন চন্দ্রিমা দলের সব ধরনের পদ ছাড়লেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দলীয় দপ্তর দখল

গত শুক্রবার বিকেলে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মেট্রোপলিটন এলাকায় তৃণমূলের ভাড়া করা রাজ্য দপ্তর দখল করে নেন বিদ্রোহীরা। এ ঘটনায় ক্ষুদ্ধ হন মমতা। এ ঘটনার জন্য তিনি প্রকারান্তরে চন্দ্রিমাকেই দায়ী করেন। মমতা গতকাল বলেন, চন্দ্রিমাই দলের রাজ্য দপ্তর বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দিয়েছেন। এ খবর শোনার পর প্রচণ্ড মর্মাহত হন চন্দ্রিমা। এরপরই তিনি রাজ্য সভাপতিসহ দলীয় সব পদ ছাড়েন। তিনি বলেন, যেখানে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি থাকে, সেখানে থাকা যায় না। পদত্যাগের পর চন্দ্রিমা সোজা চলে যান বিধানসভা ভবনে। সেখানে গিয়ে তিনি বৈঠক করেন বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রতের সঙ্গে।

মমতার নতুন দায়িত্ব বণ্টন

চন্দ্রিমার বিদায়ের পর মমতা দোষ চাপান দলের ‘বিশ্বাসঘাতক’ নেতাদের ওপর। মমতা ঘোষণা দেন, এবার তিনিই রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব সামলাবেন। আর রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করবেন দুই বিধায়ক কুণাল ঘোষ ও মদন মিত্র। মমতা বলেন, কেউ একজন চলে গেলে কিছু যায়–আসে না। হয়তো দলের প্রতীক ‘জোড়া ঘাসফুল’ হারাতে পারেন তাঁরা। কিন্তু তাতে তিনি শঙ্কিত নন। মানুষ এখনো তাঁদের দিকে চেয়ে আছে।

দপ্তর দখল প্রসঙ্গে মমতা

দলের রাজ্য দপ্তরের দখল বিদ্রোহীদের নেওয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে কথা বলেন মমতা। তিনি বলেন, ভবনটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। তাঁরা ভাড়াবাবদ প্রতি মাসে এক লাখ রুপি করে দিচ্ছেন। সব রসিদ তাঁদের কাছে আছে। ভবনটির মালিকের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি আগামী বছরের অক্টোবরে শেষ হওয়ার কথা। বিদ্রোহীরা কারা? বিদ্রোহীদের কী অধিকার আছে? তৃণমূল দপ্তর কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটা দলের সম্পত্তি। আর সেই দলের প্রধান তিনি। চন্দ্রিমাকে একহাত নিয়ে মমতা বলেন, তিনি (চন্দ্রিমা) দপ্তরটা বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দিয়ে এসেছেন। কারণ, দপ্তর দখলের সময় ভবনে চন্দ্রিমা উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচন কমিশনের চিঠি

এদিকে কে আসল তৃণমূল, তা জানতে চেয়ে মমতার তৃণমূল ও ঋতব্রতের তৃণমূলের কাছে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তারা বলেছে, আগামীকাল সোমবারের মধ্যে এ বিষয়ে বক্তব্য জানাতে হবে। মমতা গতকাল নির্বাচন কমিশন তথা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, ‘ভ্যানিশ কুমার বাবু আমাদের পার্টিকে ফিনিশ করার জন্য ইলেকশনটাও করেছে। আমাদের সিম্বল (জোড়া ঘাসফুল) দিয়ে দিলে কী আসে–যায়? সিম্বল সেটা হয়, যেটা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেন।...তাই সিম্বল হাতছাড়া হলেও তাতে কিছু আসে–যায় না।’ ২৮ বছর আগে যখন দলের জন্ম হয়েছিল, তখন মানুষকে দলীয় প্রতীক চেনাতে মাত্র ৫২ দিন সময় পেয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেন মমতা। তিনি বলেন, তারপরও এই রাজ্যে জোড়া ঘাসফুল প্রতীক দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তাই প্রতীক নিয়ে গেলেও তাঁদের কণ্ঠ রোধ করা যাবে না।

শুভেন্দুকে শুভেচ্ছা

রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দুই মাসের মাথায় গতকাল বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে প্রথম শুভেচ্ছা জানান মমতা। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে তিনি রাজ্যে চলমান রাজনৈতিক হিংসার কথা তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে বিজেপির রাজ্য সরকারের দায়িত্ব তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। যদিও রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল গত ৪ মে প্রকাশের পর মমতা তাঁর দলের পরাজয় মেনে নিতে পারছিলেন না। মমতা বারবার বলে আসছিলেন, তৃণমূল হারেনি। কারচুপি করে তৃণমূলকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল মমতা তাঁর বার্তায় শুভেন্দুর নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘যিনি আজ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, আমার অনেক শুভেচ্ছা থাকবে।’ রাজ্যে ‘রাজনৈতিক হিংসার’ কথা উল্লেখ করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘অত্যাচার করবেন না। মনে রাখবেন, এটা কিন্তু একদিন ফিরে আসতে পারে। প্রতিটি কাজের প্রতিক্রিয়া থাকে। আপনারা যত অত্যাচার করবেন, আমরা তত বাড়ব।’