বৈশ্বিক সংকটের মাঝেও আশার আলো: কেন আমরা এখনও ভালো আছি
বৈশ্বিক সংকটের মাঝেও আশার আলো: কেন এখনও ভালো আছি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন অনেক সংকটকাল এসেছে, যার প্রভাব এক দিনে দূর হয়নি। বরং একটি বিপর্যয়ের ক্ষত শুকানোর আগেই আরেকটি দুর্যোগ মানবসমাজকে আঘাত করেছে। ২০২০ ও ২০২১ সালের করোনা মহামারি সমগ্র বিশ্বকে যেভাবে বিপর্যস্ত করেছিল, তার প্রভাব থেকে পৃথিবী সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হওয়ার আগেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রভাব এখনো বিশ্বকে বহন করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে শুরু হয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিকে আরো অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

নীরব বিপদ: জলবায়ু পরিবর্তন থেকে জ্বালানিসংকট

এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানিসংকট, ঋণসংকট এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার মতো আরো অনেক বিপদ নীরবে মানবসভ্যতাকে ঘিরে ধরেছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে—আমরা অত্যন্ত দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। প্রখর দাবদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত, বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়ম, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে মানুষ আজ ক্লান্ত ও উদ্বিগ্ন। তাই আমরা ভালো নেই—এই কথাটি বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

ইতিহাসের শিক্ষা: বর্তমান সংকট তুলনামূলক সহনীয়

কিন্তু ইতিহাস আমাদের একটি নির্মম সত্য শেখায়। মানুষ যা বর্তমানের চরম দুর্দশা বলে মনে করে, কালের প্রবাহে অনেক সময় সেটাই অপেক্ষাকৃত সহনীয় বলে প্রতীয়মান হয়। বর্তমানকে মূল্যায়ন করার জন্য অতীতের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা—উভয়কেই বিবেচনায় নিতে হয়। সেই বিচারে আজও হয়তো বলার অবকাশ রয়েছে—আলহামদুলিল্লাহ, আমরা এখনো ভালোই আছি। কারণ, বিশ্বের অর্থনীতি আজ এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ও অর্থনীতিবিদরা প্রবৃদ্ধির মন্দা, মূল্যস্ফীতির পুনরুত্থান এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য ও পরস্পর নির্ভরশীল বিশ্ব

যুদ্ধের ময়দানে আমরা অংশগ্রহণ না করলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য আমাদেরও দিতে হয়। জ্বালানি, খাদ্যশস্য, পরিবহন ব্যয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রতিটি স্তরে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের অর্থনীতিকে স্পর্শ করে। বিশ্ব আজ এতটা পরস্পর নির্ভরশীল যে, এক প্রান্তের সংঘাত অন্য প্রান্তের সাধারণ মানুষের ভাতের থালায়ও প্রভাব ফেলে।

প্রকৃতির সতর্কবার্তা: সুপার এল নিনোর আশঙ্কা

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি প্রকৃতিও যেন মানবজাতির প্রতি কঠিন সতর্কবার্তা উচ্চারণ করছে। কথিত 'সুপার এল নিনো'-র সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় স্থান পেয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, এই প্রাকৃতিক ঘটনাপ্রবাহ কেবল তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা অনাবৃষ্টির কারণ হয় না—এটি কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, জলসম্পদ এবং মানুষের জীবনযাত্রার উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, মানবসভ্যতা আজ এক দ্বিমুখী সংকটের সম্মুখীন—একদিকে মানুষের সৃষ্ট যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংঘাত, অন্যদিকে প্রকৃতির অনিশ্চিত প্রতিক্রিয়া।

সংকটের মাঝেও আশার বীজ

তবে এই সব বাস্তবতার আড়ালে আরেকটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। মানবসভ্যতা কখনো কেবল স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়নি। বরং প্রতিটি সংকটই তাকে নতুন করে ভাবতে, শিখতে এবং নিজেকে পুনর্গঠিত করতে বাধ্য করেছে। ইতিহাসের প্রতিটি দুর্যোগের আড়ালে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার বীজও নিহিত থাকে; কিন্তু সেই সম্ভাবনা তখনই বিকশিত হয়, যখন মানুষ বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখে। হতাশা মানুষকে দুর্বল করে; কিন্তু প্রস্তুতি মানুষকে শক্তিশালী করে।

উপসংহার: আশাবাদী থাকার যুক্তি

অতএব, বর্তমান সময়কে আমরা হয় একটি দুর্দশার কাল বলে দেখতে পারি, অথবা একটি সতর্কবার্তা বলে গ্রহণ করতে পারি। দ্বিতীয় পথটিই অধিকতর প্রজ্ঞার পরিচায়ক। আজ যখন প্রকৃতি প্রখর উত্তাপে অতিষ্ঠ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত, তখনো আষাঢ়ের রহমতের বৃষ্টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মহান সৃষ্টিকর্তার নিয়ামত কখনো শেষ হওয়ার নয়। সংকটের মধ্যেও আশার আলো থাকে, অন্ধকারের মধ্যেও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে। সুতরাং—আলহামদুলিল্লাহ, এই বেশ ভালো আছি!