জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনীতি ও তারেক রহমানের মালয়েশিয়া-চীন সফর: ধারাবাহিকতা ও তাৎপর্য
জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনীতি ও তারেক রহমানের সফর

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রদর্শনের ভিত্তি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বিবর্তনের ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একটি স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছেন। তিনি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে সমন্বিত করে একটি বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। তার সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে পথ খুঁজছিল। জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে কোনো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও মর্যাদা কেবল সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না, বরং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল।

‘বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, নির্ভরতা কারও ওপর নয়’

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ‘বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, কিন্তু নির্ভরতা কারও ওপর নয়’—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে স্ট্রাটেজিক অটোনমি (Strategic Autonomy) বলা হয়। তিনি পশ্চিমা বিশ্ব, মুসলিম বিশ্ব এবং পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান শক্তিগুলোর সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণ করেছিলেন। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তার কূটনৈতিক দূরদর্শিতার সাক্ষ্য বহন করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রশ্নে পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্ব ক্রমবর্ধমান। চীন বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, আর মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি ধরা পড়বে না। বরং এটি বাংলাদেশের পূর্বমুখী কূটনীতির একটি নতুন অধ্যায়, যা জিয়াউর রহমানের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিকতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় Indo-Pacific, Regional Connectivity, Supply Chain Integration এবং Economic Diplomacy ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যে রাষ্ট্রগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবাহের সঙ্গে নিজেদের কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে পারছে, তারাই উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্যও এই বাস্তবতা সমানভাবে প্রযোজ্য। ফলে চীন ও মালয়েশিয়ার মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; বরং এটি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পূর্বমুখী কূটনীতির ঐতিহাসিক ভিত্তি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে ‘পূর্বমুখী কূটনীতি’ (Look East Orientation) কোনো নতুন ধারণা নয়। এর বীজ রোপিত হয়েছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে, যখন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বিশ্বের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। জিয়াউর রহমান সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে বাংলাদেশকে একটি বহুমাত্রিক কূটনৈতিক পরিচয়ের দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তার দৃষ্টিতে পররাষ্ট্রনীতি ছিল কেবল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার উপায় নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy) অর্জনের একটি মাধ্যম।

আজ যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করছেন, তখন এই সফরকে শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনৈতিক দর্শনের একটি সমসাময়িক পুনর্পাঠ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

চীন ও মালয়েশিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে চীন তখনও বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠেনি। কিন্তু Deng Xiaoping-এর সংস্কারের ফলে যে নতুন অর্থনৈতিক যুগের সূচনা হচ্ছিল, তার সম্ভাবনা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে তিনি কেবল একটি কৌশলগত ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবে দেখেননি, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করেছিলেন। বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের কেন্দ্রবিন্দুতেও রয়েছে বিনিয়োগ, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, শিল্পাঞ্চল, তিস্তা প্রকল্প এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতা। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে পূর্বমুখী কূটনীতি কোনো সাময়িক নীতি নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা।

একইভাবে মালয়েশিয়ার গুরুত্বও শুধুমাত্র শ্রমবাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ASEAN-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক সংযোগ এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে মালয়েশিয়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের সময়ে মুসলিম বিশ্ব ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশকে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে গড়ে তোলার যে চিন্তা দেখা যায়, তারই আধুনিক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বর্তমান সফরে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট ও উপসংহার

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের Complex Interdependence Theory অনুযায়ী, আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রসমূহ কেবল সামরিক শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, যোগাযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। Keohane ও Nye-এর এই তত্ত্বের আলোকে দেখলে মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আজকের বিশ্বে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাজার। ফলে পূর্বমুখী কূটনীতি শুধু ভূরাজনৈতিক কৌশল নয়; এটি অর্থনৈতিক রূপান্তরেরও একটি হাতিয়ার।

জিয়াউর রহমানের SAARC-ভাবনার সঙ্গে বর্তমান পূর্বমুখী কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি দক্ষিণ এশিয়াকে কেবল সংঘাতের অঞ্চল হিসেবে নয়, সহযোগিতার অঞ্চল হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। SAARC-এর ধারণার মাধ্যমে তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতা, আন্তঃনির্ভরশীলতা এবং বহুপাক্ষিক সংলাপের একটি কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন। আজকের বিশ্বে সেই ধারণা আরও বিস্তৃত হয়ে Indo-Pacific, ASEAN Connectivity এবং Regional Economic Integration-এর মতো নতুন বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নকে সেই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগনীতির অংশ হিসেবেও দেখা যায়।

সর্বোপরি বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে যদি একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা হয়, তবে এটি জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনৈতিক দর্শনের একটি সমসাময়িক সম্প্রসারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। জিয়াউর রহমান যে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, পূর্বমুখী অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সেই নীতির প্রাসঙ্গিকতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য পূর্বমুখী কূটনীতি আজ আর শুধু একটি বিকল্প নয়; বরং একটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা। আর সেই কারণেই মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেবল একটি কূটনৈতিক সফর হিসেবে নয়, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রকৌশলের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও দেখা উচিত।

লেখক: ড. মো. রুহুল আমিন সরকার, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা