ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই মহল্লাবাসীর সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে সুমন শেখ (১৮) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে চলা সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাঁকে প্রথমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সংঘর্ষের বিবরণ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যা থেকে ভাঙ্গা পৌরসভার পূর্ব হাসানদিয়া ও কাপুড়িয়া সদরদী মহল্লার কিশোরদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এর জেরে রাত পৌনে ৮টার দিকে দুই মহল্লার শত শত লোক দেশীয় অস্ত্র, ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে কুমার নদের দুই পাড়ে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়, যা রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলে।
সংঘর্ষ চলাকালে অন্তত চারটি গুলির শব্দ শোনা যায় বলে জানিয়েছেন একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী। এ সময় সুমন শেখ গুলিবিদ্ধ হন। তাঁকে উদ্ধার করে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁর চোয়ালে গুলির আঘাতের বিষয়টি শনাক্ত করেন। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আহত ও আটক
এ সংঘর্ষে আরও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে প্রায় দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে এবং বেশ কয়েকটি দোকানপাট ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের ঘটনায় ১৭ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল রাতে উপজেলার হাসামদিয়া ও আতাদী গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়।
সুমন শেখ ভাঙ্গা পৌরসভার কাপুড়িয়া সদরদী মহল্লার বাসিন্দা ও মিলন শেখের ছেলে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য
সুমনের বন্ধু হাবিবুর রহমান বলেন, রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁরা সুমনকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান। সেখানে চিকিৎসক প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, হাসপাতালে আনার আগেই সুমনের মৃত্যু হয়েছে।
ভাঙচুর ও যানজট
সংঘর্ষের একপর্যায়ে কাপুড়িয়া সদরদী মহল্লার লোকজন পিছু হটলে পূর্ব হাসানদিয়া মহল্লার লোকজন কুমার নদের সেতু পার হয়ে ভাঙ্গা বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চলে আসে। এ সময় সেখানে কয়েকটি দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংঘর্ষের কারণে গতকাল রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে এবং দূরপাল্লার যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন।
পুলিশি ব্যবস্থা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর দুই পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হেলাল উদ্দিন বলেন, সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে প্রায় দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।
ভাঙ্গা থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই মহল্লাবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষে গুলির ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
নিহতের পরিবারের শোক
আজ বুধবার সকালে ছেলের জামাকাপড় ও জুতা-স্যান্ডেল বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছিলেন সুমনের মা। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।’
আজ সকাল ৯টার দিকে সুমনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে ওসি বলেন, ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহটি দুপুরের পর গ্রামে আনা হবে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।



