পার্বত্য অঞ্চলে আয়কর অব্যাহতি তুলে নেওয়ার প্রস্তাবে উদ্বেগ
পার্বত্য অঞ্চলে আয়কর অব্যাহতি তুলে নেওয়ার প্রস্তাবে উদ্বেগ

বাগান থেকে ডিঙি নৌকা ভর্তি আনারস নিয়ে রাঙামাটি শহরে বিক্রির জন্য এনেছেন এক বাগানি। পাহাড়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এতদিন আয়কর অব্যাহতি ছিল। অব্যাহতি তুলে নিলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে দুশ্চিতায় পড়েছেন পাহাড়ের বাসিন্দারা। ১৬ জুন সকালে তোলা ছবি: সুপ্রিয় চাকমা

আয়কর অব্যাহতি তুলে নেওয়ার প্রস্তাব

পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর আয়কর অব্যাহতি তুলে নেওয়ার জন্য বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে এই অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই সুবিধা তুলে নেওয়া হলে আর্থসামাজিকভাবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষজন আরও পিছিয়ে পড়বে বলে বিশিষ্টজনেরা মন্তব্য করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তিন পার্বত্য জেলার চারজন সংসদ সদস্য অর্থমন্ত্রীকে চিঠিও দিয়েছেন।

সংসদ সদস্যদের চিঠি

গত রোববার পার্বত্য অঞ্চল থেকে নির্বাচিত (সংরক্ষিত নারী আসনসহ) চার সংসদ সদস্য আয়কর অব্যাহতি বহাল রাখার জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে লিখিত দাবি জানিয়েছেন। চার সংসদ সদস্য হলেন, খাগড়াছড়ির আবদুল ওয়াদুদ ভূঞা, রাঙামাটির দীপেন দেওয়ান, বান্দরবানের সাচিংপ্রু জেরী এবং সংরক্ষিত ৩৪ আসনের মাধবী মারমা। চিঠিতে তাঁরা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষজনকে মূলধারায় যুক্ত করার জন্য আয়কর অব্যাহতির বিধান রাখা হয়েছিল। ১৮ জুন রাঙামাটির সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান সংসদে আয়কর অব্যাহতি বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্তমান আইন ও প্রস্তাবিত পরিবর্তন

জানা গেছে, বাজেট অধিবেশনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আয়কর অব্যাহতির বিষয়টি সংশোধনের জন্য অর্থ বিলে প্রস্তাব করে সংসদে পেশ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি সংসদে পাস হলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বেতন ও আর্থিক পরিসম্পদের আয় (ব্যাংকে আমানত, সঞ্চয়পত্র প্রভৃতি) ছাড়া অন্য সব আয়-উপার্জন আয়করের আওতায় আসবে। অর্থাৎ, তাঁদের আয়কর দিতে হবে। বর্তমানে ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ষষ্ঠ তফসিলের ১৯ ধারা অনুযায়ী পার্বত্য অঞ্চলে পরিচালিত সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী আয়করমুক্ত সুবিধা ভোগ করেন।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ের ১৯২২ সালের আয়কর আইনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ দেশব্যাপী আয়কর অব্যাহতি সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন। কিন্তু ১৯৮৪ সালের সংশোধিত আয়কর অধ্যাদেশে তাঁদের শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের আইনে ১৯৮৪ সালের অধ্যাদেশে প্রদত্ত সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের যুক্তি

অর্থমন্ত্রীর কাছে আয়কর অব্যাহতি সুবিধা বহাল রাখার আবেদনে চার সংসদ সদস্য বলেছেন, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ এবং ২০২৩ সালের আয়কর আইনে ষষ্ঠ তফসিলে আয়কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ‘উপজাতিদের’ কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তির আয়, যা কেবল পার্বত্য জেলায় পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে উদ্ভূত, তা আয়করমুক্ত হবে।

সংসদ সদস্যরা বলেন, দেশের সাড়ে ১৬ লাখ ‘উপজাতির’ মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯ লাখ ৮৯ হাজার ২৯৮ জনের সিংহভাগের পেশা জুমচাষ ও কৃষি। কাপ্তাই বাঁধের কারণে এই অঞ্চলের ৭০ শতাংশ কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা অধিকাংশ ‘উপজাতি’। এ ছাড়া নগণ্যসংখ্যক দোকানদার এবং পাঁচ হাজারের মতো সরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন। এখনো পাহাড়িদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ সুপেয় পানির আওতার বাইরে, ৪৫ শতাংশ বিদ্যুৎ এবং ৫০ শতাংশ স্বাস্থ্যসুবিধাবঞ্চিত। সামগ্রিকভাবে ৮০ শতাংশ পাহাড়ি আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। এ অবস্থায় তাঁদের আয়কর অব্যাহতির সুবিধা অব্যাহত রাখা উচিত।

রাজনৈতিক প্রভাব

তাঁরা বলেন, এবারের নির্বাচনে বেশিসংখ্যক ভোটে বিএনপির প্রার্থীরা পার্বত্য অঞ্চলে বিজয়ী হয়েছেন। আয়কর অব্যাহতি তুলে নিলে ভবিষ্যতে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ জন্য আয়কর অব্যাহতি বহাল রেখে আইনে সংশোধনী আনার প্রস্তাব করেন সংসদ সদস্যরা।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মংক্যশোয়েনু নেভী এবং হাইকোর্টের আইনজীবী প্রতিকার চাকমা আয়কর অব্যাহতি তুলে নেওয়ার পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ঔপনিবেশিক সময় থেকে পশ্চাৎপদ এলাকা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কয়েক দশক ধরে চলা অশান্ত পরিস্থিতি এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে দেশের অন্য প্রান্তের সঙ্গে সমভাবে এগোতে বাধাগ্রস্ত করেছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্য ও পাহাড়ি জমিতে ফলদ-বনজ বাগান করে আর্থসামাজিক সচ্ছলতা আনার চেষ্টা করছেন। দেশের মূলধারার সঙ্গে সমভাবে অন্তর্ভুক্তির সক্ষমতা অর্জনের জন্য করমুক্তির সুবিধাসহ আরও নানা প্রণোদনা দেওয়া দরকার। কিন্তু সেটা না করে আয়কর অব্যাহতি তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে পাহাড়ে বৈষম্য বাড়বে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি।