সাতক্ষীরা জেলার পারিবারিক আদালত-২-এর বিচারক মো. হাসানুল বান্না এক অসুস্থ শিশুর চিকিৎসা ও ভরণপোষণের জন্য তার বাবাকে নির্দেশ দিয়েছেন। গত ১২ এপ্রিল রায়ে বিচারক শিশুটির বাবাকে অস্ত্রোপচারের পুরো খরচ বহন ও নিয়মিত ভরণপোষণ দেওয়ার আদেশ দেন।
শিশুটির রোগ ও শারীরিক অবস্থা
শিশুটি ‘ভাস্কুলার ম্যালফরমেশন’ নামক রোগে ভুগছে, যা রক্তনালির গঠনগত ত্রুটি। এ কারণে তার বাঁ হাতে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল না হওয়ায় হাতটি ডান হাতের তুলনায় অস্বাভাবিক ফোলা ও কালচে বর্ণের। চিকিৎসার কাগজপত্র অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের জন্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা প্রয়োজন।
মামলার পটভূমি
শিশুটির বাবা-মায়ের বিয়ে হয় ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এবং বিবাহবিচ্ছেদ হয় ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর। শিশুটি মায়ের সঙ্গে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় থাকে, বাবার বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলায়। বাবা ঢাকায় একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
গত বছরের মার্চে শিশুটির মা দেনমোহর, ভরণপোষণ ও ছেলের চিকিৎসার খরচ চেয়ে আদালতে আরজি করেন। মামলার ১৩ মাস পর রায়ে বিচারক শিশুটির বাবাকে ২ লাখ ৫১ হাজার টাকা অস্ত্রোপচার খরচ, ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেনমোহর ও ১৩ মাসের বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ ৩৯ হাজার টাকা পরিশোধের আদেশ দেন। এছাড়া রায়ের পর থেকে মাসিক ৮ হাজার টাকা ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালতে শিশুর উপস্থিতি
বাদীর আইনজীবী মো. ফেরদৌস হোসেন জানান, এক শুনানির দিন শিশুটিকে আদালতে আনা হলে বিচারক তাকে ডায়াসে ডেকে নেন এবং তার বাঁ হাতের অস্বাভাবিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। বিচারক সেদিন কোনো মন্তব্য না করলেও রায়ে তার পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন ঘটে।
আইনজীবী ফেরদৌস হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলেটি ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর বিচারককে আমরা অনুরোধ করেছিলাম যেন তিনি শিশুটিকে দেখেন। শিশুটিকে এক শুনানির দিন আদালতে নেওয়া হয়। তখন বিচারক শিশুটিকে ডায়াসে ডেকে নেন। তিনি দেখেন যে শিশুটির বাম হাত অস্বাভাবিক ফোলা ও কালচে বর্ণ ধারণ করেছে।’
পূর্ববর্তী আদেশ ও বাবার অনিয়ম
মামলা চলাকালে বিচারক শিশুটির বাবাকে মাসে ৩ হাজার টাকা ভরণপোষণ দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মাত্র তিন মাস এ আদেশ মেনে মোট সাড়ে ১০ হাজার টাকা দেন। আইনজীবী ফেরদৌস হোসেন বলেন, ‘এর আগের আদালতে বাদী ও সাক্ষীর জেরা শেষ হয়ে যায়। পারিবারিক আদালত-২ নম্বরে যখন মামলাটি পরিচালনা শুরু হয়, তখন বিবাদীর সাক্ষী, জেরা ও যুক্তিতর্ক বাকি ছিল। শিশুটির বাবার পক্ষ থেকে আইনজীবী বারবার সময় পেছাচ্ছিলেন। অজুহাত দিতেন যে “অফিস থেকে ছুটি পাচ্ছেন না।” বিচারক একদিন বলেন যে “আপনারা কবে সময় দিতে পারবেন বলেন, সে অনুযায়ী শুনানির ডেট দেব।”’
মামলার প্রক্রিয়া ও অন্যান্য তথ্য
মামলাটি পুরোনো প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়, কারণ তখন পৃথক পারিবারিক আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন ২০২৬-এর আওতায় মধ্যস্থতার বিধান কার্যকর হয়নি। পরে পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩-এর আওতায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে পৃথক পারিবারিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়।
শিশুটির মা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পারিবারিক আদালতে আমি অভিযোগ করেছিলাম। সেই রায় হয়েছে। তবে আমি রায়ের কপি এখনো হাতে পাইনি।’
শিশুটির বাবার ছোট ভাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভরণপোষণের রায়ের কথা আমি শুনেছি। আদালত যখন রায় দিয়েছেন, তখন আমার ভাই নিশ্চয়ই তা পালন করবেন।’ তবে শিশুটির বাবার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি সাড়া দেননি।



