বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) সম্প্রতি দাবি করেছে, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহকে আজীবনের জন্য দেওয়া 'প্রফেসর ইমেরিটাস' নিয়োগ ছিল বিধিবহির্ভূত ও বেআইনি। বিশ্ববিদ্যালয়টি ওই অধ্যাপকের অনুকূলে দেওয়া বেতন ও ভাতা ফেরত দিতেও বলেছে। (প্রথম আলো, ২৫ জুন ২০২৬) এই ঘটনা দেশের শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক নীতিমালা
বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও মোটামুটি সব বিশ্ববিদ্যালয়েই এই পদটি রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, অবসর নেওয়ার পর একজন সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদধারীরা সাধারণভাবে ইমেরিটাস মর্যাদা লাভ করতে পারেন। তবে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হতে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়—বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ১০ বছর অধ্যাপনা করা এবং শিক্ষা, গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখা।
বোস্টন ইউনিভার্সিটির নীতিমালায় বলা হয়েছে, অবসরের পর অধ্যাপকদের বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজ নিজ বিদ্যাক্ষেত্রে আজীবন অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ইমেরিটাস মর্যাদা দেওয়া হয়। এই মর্যাদা সংশ্লিষ্ট বিভাগের সুপারিশের পর ডিনের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সে অধ্যাপক পদ থেকে অবসর নেওয়া শিক্ষক ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি পান। জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়েও একজন অধ্যাপকের দীর্ঘ ও অসামান্য একাডেমিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অবসরের পর ইমেরিটাস প্রদান করা হয়।
ডা. আবদুল্লাহর ইমেরিটাস নিয়োগের ঘটনা
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ২০২৪ সালের ২০ জুন (স্মারক নম্বর বিএসএমএমইউ/২০২৪/৬২৯) প্রজ্ঞাপনে ৯২তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহকে ইমেরিটাস পদে আজীবনের জন্য নিয়োগ প্রদান করে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষার উন্নয়ন ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এই নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ইমেরিটাস নিয়োগ অধ্যাদেশ' ৯-১০ ধারা অনুযায়ী, ওই অধ্যাপক গবেষণা ও প্রকাশনার জন্য পাঠাগার ও গবেষণাগারের সুবিধা পাবেন এবং গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুদানও পেতে পারেন।
তবে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জারি করা অফিস আদেশের উদ্ধৃতি দিয়ে বলছে, ৬৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ এবং ৮৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধ্যাপক আবদুল্লাহকে তিন বছরের জন্য ইমেরিটাস প্রফেসর নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সেই নিয়োগকালে তাঁকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানী, চিকিৎসার সুবিধা ও সীমিত প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সিন্ডিকেট এই নিয়োগ নিয়ে কোনো আপত্তি করেনি। কিন্তু ২০২৪ সালের ২০ জুন, নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগে, অধ্যাপক আবদুল্লাহর মাসিক সম্মানী তাঁর অবসরের সময়ের বেতন-ভাতার সমান নির্ধারণ করা হয়—যা বর্তমান প্রশাসনের মতে বিধিবহির্ভূত।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও প্রতিক্রিয়া
গবেষক ড. নাদিম মাহমুদ (ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়) এই ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, 'বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন কাউকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সেটি কখনোই সময়ের ফ্রেমে বন্দী করে নয়, এটি অবশ্যই আজীবনের জন্য হয়ে থাকে।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাঁরা ইমেরিটাস অধ্যাপক হয়েছেন, তাঁরা কেউ দুই বা তিন বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হননি। বরং এই স্বীকৃতি অতীব সম্মানের হওয়ায় তা আজীবন ধরে ওই অধ্যাপক বহন করতে পারেন।
ড. নাদিম মাহমুদ আরও বলেন, 'অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, সেটি রাষ্ট্রীয় নিয়োগ, কখনোই রাজনৈতিক নিয়োগ নয়। এখন যদি বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এটিকে মার্ক করে কাউকে হেনস্তা করে, তাহলে সেটি প্রতিহিংসার ফসল বলে জনমনে ধারণা হতে পারে।' তিনি উল্লেখ করেন যে, ৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনার দপ্তরের অনেকে আত্মগোপনে বা দেশত্যাগী হলেও ডা. আবদুল্লাহ দেশের ভেতর থেকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে যাচ্ছেন এবং নিয়মিত পত্রিকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন।
ড. নাদিম মাহমুদ মনে করেন, 'যোগ্য ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত চিন্তার ঊর্ধ্বে রেখে প্রাপ্ত সম্মান বুঝিয়ে দেওয়া উচিত, তাহলে আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব।' তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার ও তার প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চর্চা বন্ধ করে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করবে।



