ঘটনার প্রেক্ষাপট
ময়মনসিংহ নগরীর রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ভাড়া বাসায় হত্যাকাণ্ডের শিকার রাজিব আহমেদ রুবেল (৩৫) হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনও উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের পরিবার এবং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে দুই ধরনের দাবি ও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। রুবেলের পরিবার বলছে, মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আর হত্যায় অভিযুক্ত চার ছেলের মায়ের দাবি, ধর্ষণের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
তবে পুলিশ বলছে, রুবেল মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ধর্ষণের অভিযোগ তোলা নারীর চার ছেলেও রুবেলের সঙ্গে মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। ধর্ষণের বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হত্যাকাণ্ডের দিন
রবিবার (৫ জুলাই) সকালে নগরীর রামকৃষ্ণ মিশন রোড সংলগ্ন ৩৬ বাড়ি কলোনি এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত রাজিব আহমেদ রুবেল নগরীর আর কে মিশন রোড এলাকার আব্দুল হামিদের ছেলে। ওই কলোনি এলাকায় ধর্ষণের অভিযোগ তোলা নারীর ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল পেয়ে দুপুরে তার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বিকালে এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই নারীর চার ছেলেকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
বাড়ির বর্তমান অবস্থা
সোমবার (০৬ জুলাই) দুপুরে রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ৩৬ বাড়ি কলোনি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একতলা একটি ভবনের পাশাপাশি ছয়টি কক্ষ। বাড়িটির মালিক ধর্ষণের অভিযোগ তোলা ওই নারী। তার ছয় ছেলে। এর মধ্যে বাসার চারটি কক্ষে চার ছেলেকে নিয়ে থাকতেন তিনি। দুই ছেলে অন্য স্থানে থাকেন। বাসার দুটি কক্ষ ভাড়া দিয়েছেন। এর একটি নিয়েছেন রাজিব আহমেদ রুবেল। অন্যটি নিয়েছেন আরেক ভাড়াটিয়া। ঘটনার পর থেকে রুবেলের কক্ষ তালাবদ্ধ আছে। ওই নারী এবং তার চার ছেলে পুলিশের হেফাজতে থাকায় তাদের চারটি কক্ষও তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে। ফলে বাসায় গিয়ে শুধু একটি কক্ষের ভাড়াটিয়া মালা বেগমকে পাওয়া যায়। তিনি সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। ইতিমধ্যে তার কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শুনেছে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মালা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে রবিবার সকাল ৭টার দিকে ঘুম থেকে উঠি। গিয়ে দেখি বাসার মালিক আন্টির কক্ষে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় রুবেল শুয়ে আছেন। আন্টির চার ছেলেও ওই কক্ষে ছিলেন। রুবেলকে ওই কক্ষ থেকে বের করতে চাচ্ছিলেন আন্টির চার ছেলে। কিন্তু রুবেল বের হচ্ছিলেন না। তাদের মারধর করছিলেন। এ নিয়ে চার ছেলের সঙ্গে রুবেলের ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতি হয়। রুবেল ও আন্টির চার ছেলে চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলেন। আন্টি চিৎকার করে বলছিলেন, “বাবা রুবেল তুমি আমার ছেলের মতো, আমাদের মাফ করে দাও। আর মারধর করো না।” কিন্তু রুবেলকে বের করতে গেলেই আন্টির ছেলেদের কিল-ঘুষি দিচ্ছিলেন। এভাবে দীর্ঘ সময় ঝগড়াঝাঁটির পর রুবেলের ভয়ে আন্টির চার ছেলে ঘর থেকে বের হয়ে যান। বেলা ১১টার দিকে আন্টিকে ওই ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসি আমি। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান ছেলেরা। রুবেল নেশাগ্রস্ত হয়ে আন্টির কক্ষে পড়ে থাকেন। এরপর আমি সেখান থেকে চলে এসে ঘরের কাজ শুরু করি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শুনতে পাই রুবেল ওই ঘরে গলাকাটা অবস্থায় পড়ে আছেন। মারামারির ঘটনা ঘটেছে, এটা আমি দেখেছি এবং বুঝতেও পেরেছে। কিন্তু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কিনা এটা আমি বুঝতে পারিনি। কখন ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তা আসলে আমার জানা নেই। হয়তো পুলিশ তদন্ত করলে বিষয়টির রহস্য জানা যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একমাস ধরে রুবেল আমার কক্ষের পাশের কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকছিলেন। বেশিরভাগ সময় বাসার বাইরে হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করতেন। তবে মাঝেমধ্যে আমি রান্না করে কিছু দিলে খেতেন। তবে প্রায় রাতে আন্টির ছেলেরা আর রুবেল মিলে নেশা করতেন। এটা আমরা প্রায় সময় দেখে আসছি।’
নিহতের পরিবারের বক্তব্য
রুবেলের বড় বোন রুনা আক্তার সোমবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রুবেল বিবাহিত। তার দুই ছেলে। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে রুবেল প্রায় একমাস আগে ওই আন্টির বাসার একটি কক্ষ ভাড়া নেয়। এরপর থেকে সেখানে থাকছিল। আন্টির চার ছেলের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। রুবেল নেশা করতো এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। এজন্যই মূলত স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেছিল। তার আগে থেকেই আন্টির ছেলেদের সঙ্গে রুবেলের বন্ধুত্ব ছিল। তারা চার ভাইও মাদক ব্যবসায় জড়িত।’
তিনি বলেন, ‘আমার ভাই ৬০ বছরের ওই নারীকে ধর্ষণ করবে এটা কোনোভাবেই মানা যায় না। কেউ বিশ্বাসও করছে না এই কথা। মূলত মাদক ব্যবসার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে ধর্ষণের নাটক সাজিয়ে রুবেলকে গলা কেটে হত্যা করেছেন আন্টির চার ছেলে। পরে শুনেছি ঘটনার আগে আন্টিকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এগুলো সবই ছিল তাদের নাটক। রুবেলের ছোট ছোট দুই ছেলে এতিম হয়ে গেলো। আমরাও ভাইকে হারালাম। যদি সত্যিই ধর্ষণের মতো কিছু ঘটে থাকে তাহলে পুলিশ তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করুক; ভাইয়ের বিচার হোক। না হয় ভাইয়ের হত্যার কঠোর বিচার চাই আমরা।’
স্থানীয়দের মতামত
ওই এলাকার সাবেক এক কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন রুবেল। বিশেষ করে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই থেকে শুরু করে এলাকায় কেউ জমি কিনতে কিংবা বাড়ি করতে আসলে তার কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। রুবেলের ভয়ে এলাকায় কেউ এসব নিয়ে মুখ খুলতো না। আর যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন অর্থাৎ ওই নারীর ছেলেরাও মাদক ব্যবসায় জড়িত। মূলত মাদক ব্যবসার বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে ধর্ষণের অভিযোগ তুললেও সেটি আসলে কতটা সত্য, তা পুলিশ বলতে পারবে। এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’
পুলিশের তদন্ত
ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রুবেলের বিরুদ্ধে থানায় ছিনতাই ও মাদক ব্যবসাসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। তবে কয়টি মামলা আছে, তা নির্দিষ্ট করতে বলতে পারছি না। রুবেল দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই এবং চাঁদাবাজিতে জড়িত ছিলেন। ওই নারীর ছেলেরাও মাদক ব্যবসায় জড়িত বলে জানতে পেরেছি। এই বিরোধে হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। ওই নারীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মর্মে এরকম কোনও আলামত এখনও আমরা তদন্তে পাইনি। তবে এখনও তদন্ত চলছে। তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবো আমরা।’
পিবিআইয়ের অবস্থান
ঘটনার পর চার ছেলেকে হেফাজতে নিয়েছে পিবিআই। ময়মনসিংহ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে জড়িত চার ভাই আমাদের হেফাজতে আছে। ওই নারীও আমাদের হেফাজতে আছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছি আমরা। প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ধারণা করছি, বাসা ভাড়া কিংবা মাদক ব্যবসার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ধর্ষণের আলামত এখনও আমরা পাইনি। তবে অধিকতর তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষেই বলা যাবে হত্যার মূল রহস্য।’



