গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ’র আয়োজনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের মাঝে ১ কোটি ১ লাখ টাকার মোট ৩৫টি চেক বিতরণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থলের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল স্বজনহারা মানুষের কান্নায় ও আহতদের আকুতিতে। টাকার অঙ্কে জীবনের মূল্য মাপা যায় না, তা প্রমাণিত হয় সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখে।
১৫ বছরের অভিজ্ঞতা বনাম এক মুহূর্তের নিয়তি
৩০ বছরের রুনা খাতুন তার দুই বছরের শিশুকে কোলে নিয়ে এসেছিলেন। তার হাতে তুলে দেওয়া হয় পাঁচ লাখ টাকার চেক। এক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তার পেশাদার চালক স্বামী। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “১৫ বছরের ড্রাইভিং অভিজ্ঞতাও উনাকে বাঁচাতে পারল না। এই টাকা দিয়ে এখন আমি কী করব? আমি তো আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটাই হারিয়ে ফেলেছি।” রুনার এখন একমাত্র লক্ষ্য পিতৃহীন সন্তানকে মানুষ করা; কিন্তু স্বামীর শূন্যতা চেকে ঢাকা পড়বে না।
নব্বই বছরের পিতার অবিনাশী শোক
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ৯০-ঊর্ধ্ব বৃদ্ধ তুলা শেখ এসেছেন তার সন্তানকে হারানোর পর অনুদান নিতে। এক বছর আগে ব্যস্ত রাস্তা পার হতে গিয়ে পিষ্ট হয়েছিল তার সন্তান। কাঁপা গলায় তিনি বলেন, “আমার যাওয়ার বয়স হয়েছিল, কিন্তু চলে গেল ছেলেটা। এমন দুর্ঘটনা যেন আর কোনো বাবার জীবনে কখনো না আসে।”
মহাসড়কের সেই অভিশপ্ত মুহূর্ত
চল্লিশ বছর বয়সি জীবন প্রসাদ ক্রাচে ভর করে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। মহাসড়কে অটোরিকশা দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন স্ত্রীকে, নিজেও ছিলেন একই অটোরিকশায়। নিজের শারীরিক পঙ্গুত্ব ও চোখের সামনে স্ত্রীর চলে যাওয়ার দৃশ্য তাকে তাড়া করে। তার কাছে এই অনুদান স্ত্রীর জীবনের বিনিময়ে অপূরণীয় সান্ত্বনা মাত্র।
কর্মক্ষম হাত থেকে কর্মহীন অন্ধকার
৪৮ বছরের মো. সোনু মিয়া ঢাকার কারওয়ানবাজারের দিনমজুর ছিলেন। একটি ট্রাকের চাকা তার জীবন থামিয়ে দেয়, কেড়ে নেয় একটি পা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি এখন অচল। তিনি বলেন, “আমার তো একটা পা চলে গেল, কিন্তু আমার অবুঝ বাচ্চা দুটোর ভবিষ্যৎ কী? ওদের কে দেখবে?” এই প্রশ্নের উত্তর কোনো চেকে লেখা থাকে না।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য ও পদক্ষেপ
অনুষ্ঠানের সভাপতি গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, “পশ্চিমা বিশ্বে হরিণ বা হাঁস রাস্তা পার হলেও গাড়ি লাইনে দাঁড়ায়; আমাদের দেশে চালকদের ধৈর্যের অভাব।” তিনি কমগতির অটোরিকশা ও সাইকেলের হাইওয়েতে দ্রুতগামী গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার বিপদের কথা উল্লেখ করেন। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি জানান, গাজীপুর জেলার মহাসড়ক সংলগ্ন হকারদের পুনর্বাসন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাইপাস সড়ক চালু, এবং শ্রমিকদের কাছ থেকে নিরাপদ যাতায়াতের প্রতিশ্রুতি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এসএম আশরাফুল আলম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, শিক্ষক ও এনজিও কর্মীরা।



