কুড়িগ্রামে সীমান্ত থেকে সরানো দম্পতি-সন্তানের খোঁজ নেই
সীমান্ত থেকে সরানো দম্পতি-সন্তানের খোঁজ নেই

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া দুই শিশুসন্তানসহ সেই দম্পতির খোঁজ পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে গয়টাপাড়া সীমান্ত এলাকা থেকে বিজিবি ও পুলিশের সহায়তায় তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

দম্পতি ও শিশুদের পরিচয়

তারা হলেন- ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরানিয়া ইউনিয়নের কংসেরকুল এলাকার বেলাল হোসেন ও সুমি আক্তার দম্পতি এবং তাদের দুই কন্যাসন্তান। মানবিক বিবেচনায় বিজিবি-বিএসএফের পতাকা বৈঠক শেষে রৌমারী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরপর রৌমারী পুলিশ পরিবারের কাছে তাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়েছিল।

পরিবারের বক্তব্য

তবে বেলালের পরিবার বলছে, এখনও বাড়ি আসেনি তারা। বেলাল ও সুমিসহ তাদের দুই মেয়ে কোথায় আছে, তাও জানে না। শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে বেলাল হোসেনের মামা আব্দুল মতিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেলাল, তার স্ত্রী ও দুই কন্যার ছবিসহ সংবাদ আমরা দেখতে পাই। তারা কুড়িগ্রাম সীমান্তের শূন্যরেখায় মাঠে আরও কিছু লোকজনের সঙ্গে অবস্থান করছে দেখতে পাই। সংবাদ ও ছবি দেখে আমরা তাদের চিনতে পারি। পরিবারের লোকজন নিয়ে আমরা কুড়িগ্রাম বিজিবি ক্যাম্পে যাই। সেখানে গিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূর থেকে বেলাল, সুমি ও তাদের দুই কন্যাসহ আরও অনেককেই মাঠে বসে থাকতে দেখি। এরপর বিজিবি ক্যাম্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। বেলাল এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাদের কাছে জমা দিই এবং বেলাল ও তার পরিবারের সদস্যদের ফেরত চাই। কিন্তু বিজিবি কর্মকর্তারা বলেন, এভাবে তাদের ফেরত দেওয়ার কোনও সুযোগ নাই। আপনারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রেখে যান। আমরা যাচাই-বাছাই শেষে তাদের আপনাদের কাছে পাঠিয়ে দেবো।’’ এরপর আমরা বাড়িতে চলে আসি।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি বলেন, ‘কিন্তু শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত বেলাল ও তার পরিবারের সদস্যরা আমাদের কাছে এসে পৌঁছেনি। আমরা অপেক্ষা করছি, কখন তারা ভালুকায় এসে পৌঁছাবে।’

একই কথা বলেছেন বেলাল হোসেনের মা হাসনা বেগম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেলালের বাবা আব্দুর রউফের এক রকম পাগলের মতো অবস্থা। কাল সকাল থেকে তাদের কোনও খোঁজ পাচ্ছি না। আমার দুই ছেলে। এর মধ্যে বেলাল বড় ও ছোট ছেলে হাশেম। হাশেমের আয় দিয়ে আমাদের সংসার চলে। বেলাল অটোরিকশা চালাতো। তার স্ত্রী এবং দুই কন্যাকে নিয়ে সংসার। বেশ কিছুদিন ধরে বেলাল আমাকে বলে আসছিল, তাকে একটি নতুন অটোরিকশা কিনে দিতে হবে। ধারকর্য করে হলেও দিতে হবে। এ নিয়ে প্রায় ঝগড়া হতো। নতুন অটো রিকশা কিনে না দেওয়ায় ঝগড়া করে ৬ জুন চাকরি করে টাকা কামিয়ে অটোরিকশা কিনবে বলে স্ত্রী সুমি ও দুই কন্যাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। তাদের সঙ্গে আমাদের এলাকার সজীব ও হিমেল যায়। জানতে পারছি, তারা প্রথমে বাড়ি থেকে বের হয়ে সিলেটে যায়। এরপর ৯ জুন সীমান্ত দিয়ে ভারতে যায়। ভারতে গিয়ে ১২ জুন তারা ভারতীয় পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। এরপর তো পত্রপত্রিকায় ছেলে, ছেলের বউ ও নাতনিদের ছবি দেখতে পাই। কিন্তু তারা এখন কোথায় আছে, কীভাবে আছে আমি কিছুই জানি না। কালকে শুনেছি, তাদের সীমান্ত থেকে বিজিবি সরাই নিছে। কিন্তু আমাদের বুঝিয়ে দেয়নি। দুশ্চিন্তায় সারারাত ঘুমাতে পারি নাই। কবে আমাদের কাছে ফিরে আসবে তাও জানি না।’

স্থানীয় প্রতিনিধির বক্তব্য

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিরুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) জৈন উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেলাল তার স্ত্রী সুমি ও তাদের দুই কন্যা শুক্রবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত বাড়ি ফেরেনি। তাদের পরিবারের কাছে প্রশাসন হস্তান্তর করেনি এতটুকু জানতে পেরেছি। তবে আমরা চাই, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে পরিবারের কাছে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হোক।’

পুলিশ ও বিজিবির বক্তব্য

বিষয়টি নিয়ে জানতে রৌমারী থানার ওসি কাওসার আলীর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তারা কোথায় জানতে চাইলে ময়মনসিংহ বিজিবির সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল নুরুল আজিম বায়েজীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভালুকার বেলাল হোসেন ও তার স্ত্রী এবং দুই কন্যার বিষয়ে আমাদের কাছে অফিসিয়ালি কোনও তথ্য নাই। এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।’

ঘটনার প্রেক্ষাপট

গত রবিবার ভোর রাতে আন্তর্জাতিক ১০৬০ মেইন পিলারের ১-এস সাব-পিলারের পাশ দিয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের দক্ষিণ সালমারা মানকারচর জেলার ঝালোরচর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা অবৈধভাবে এক নারী, তিন পুরুষ, দুই শিশুসহ ছয় জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশইনের চেষ্টা করে। বিজিবি ও স্থানীয় জনতার বাধায় তারা সীমান্তের শূন্যরেখার ভারতীয় অংশে আটকা পড়েন। একই রাতে আন্তর্জাতিক ১০৬৬ মেইন পিলারের কাছ দিয়ে ভারতের মানকারচর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা আরও তিন যুবককে ভন্দুচর এলাকা দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করলে বিজিবির তৎপরতায় তারাও শূন্যরেখায় আটকে যান। সবমিলিয়ে মোট ৯ জন নাগরিক খোলা আকাশের নিচে আটকে পড়েন।

সীমান্তের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে ভালুকার বিরোনিয়া ইউনিয়নের কংসেরকুল গ্রামের বেলাল হোসেন (২৮), তার স্ত্রী সুমি আক্তার (২৬) ও তাদের দুই সন্তান ফাইমা (৫ মাস) ও ফাতেমা আক্তার (৪) চরম অসুস্থ হয়ে পড়ায় এবং তাদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলে বিজিবি ও বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার বিজিবি-বিএসএফের একটি যৌথ মেডিক্যাল টিম শূন্যরেখায় গিয়ে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। পরে ওই দিন রাতেই পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে শিশুসহ দম্পতিকে উদ্ধার করা হয়।

অবশেষে শূন্যরেখার কাছ থেকে দুই শিশুসন্তানসহ ওই দম্পতিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে তাদের সঙ্গে শূন্যরেখায় থাকা অপর দুই যুবক ওই স্থানেই রয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকালে তাদের গয়টাপাড়া সীমান্ত এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। শৌলমারী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ জহুরুল ইসলাম গয়টাপাড়া সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের বরাতে এ তথ্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়ে ছিলেন।

তবে এ বিষয়ে বিজিবির গয়টাপাড়া ক্যাম্প কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। জামালপুর বিজিবি ৩৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়কের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকেও পাওয়া যায়নি। ফলে ঠিক কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় দুই শিশু সন্তানসহ দম্পতিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। তাদের পরবর্তী ঠিকানা কোথায় তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গ্রাম পুলিশ জহুরুল ইসলাম গতকাল জানিয়ে ছিলেন, বৃহস্পতিবার সকালে জামালপুর থেকে গাড়ি এসেছিল। ওই গাড়িতে করে শূন্যরেখায় থাকা দম্পতি ও তাদের বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে শুনলাম। প্রাইভেট গাড়ির সঙ্গে বিজিবির গাড়িও ছিল। এখন সীমান্তের শূন্যরেখার ওই স্থানে এখন শুধু দুই যুবক আছে। দুই শিশু ও তাদের বাবা-মাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা জানা যায়নি।

গয়টাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রুহুল বলেন, ‘আমি ওদেরকে থাকার জন্য মশারি দিয়েছিলাম। আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে মশারি আনতে গিয়ে দেখি বাবা-মা আর বাচ্চা দুইটা নাই। কোথায় গেছে জানি না। তবে বাকি দুই জন আছে। ওখানে বিজিবি-বিএসএফের পাহারাও আছে।’

স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, বৃহস্পতিবার সকালে ওই দম্পতিকে রৌমারী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে বিজিবি। পরে পুলিশ তাদেরকে নিজ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।