ঢাকার যানজট নিরসনে রাজধানীর সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া—এই চার আন্তজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা জনভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করে পরিকল্পনা ও উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা ও নীতিবিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
পরিকল্পনার সমালোচনা
সংস্থাটি বলছে, কার্যকর পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত গণপরিবহন সংযোগ নিশ্চিত না করে শুধু টার্মিনালগুলো শহরের প্রান্তে কাঁচপুর, হেমায়েতপুর, টঙ্গী ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নিলে যানজট সমস্যার টেকসই সমাধান হবে না। বরং মানুষের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি বাড়বে। রবিবার (২১ জুন) আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের সই করা এক বিবৃতিতে এসব কথা জানানো হয়।
গণপরিবহন সংকট
আইপিডির মতে, ২ কোটির বেশি জনসংখ্যার ঢাকা মহানগরীর যাতায়াতব্যবস্থাকে টেকসই করতে শহরের বর্ধিত এলাকায় নতুন বাস ডিপো ও বাস টার্মিনাল নির্মাণ প্রয়োজন। তবে বিদ্যমান চারটি বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয় এবং পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকেও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। তাই এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সরকারের সিদ্ধান্ত
সম্প্রতি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঢাকার যানজট কমাতে ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে, মহাখালী টার্মিনাল অস্থায়ীভাবে পূর্বাচলে এবং পরে টঙ্গীর কাছে, গাবতলী টার্মিনাল হেমায়েতপুরে এবং সায়দাবাদ-যাত্রাবাড়ী টার্মিনাল কাঁচপুরে সরিয়ে নেওয়া হবে।
যানজটের প্রকৃত কারণ
আইপিডির মতে, ঢাকার যানজটের জন্য এসব টার্মিনালকে দায়ী না করে যানবাহন ও পরিবহন খাতের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলাকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সংস্থাটি বলছে, বাস টার্মিনালগুলোতে মূল সড়কে যাত্রী ওঠানামা, অবৈধ পার্কিং ও চাঁদাবাজিসহ নানা সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে টার্মিনালসংলগ্ন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু সমস্যার সমাধান না করে টার্মিনালগুলোকে মূল শহর থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হলে যাতায়াত ব্যয়, নিরাপত্তাঝুঁকি, সংযোগ সড়কের ওপর চাপ এবং সামগ্রিক জনভোগান্তি আরও বাড়বে।
ভোগান্তির আশঙ্কা
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত চারটি টার্মিনালই মূল শহর থেকে ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে। এসব এলাকা থেকে ঢাকার কেন্দ্রীয় অংশে পৌঁছাতে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন পর্যাপ্ত নয়। রাতের বেলায় নিরাপত্তাঝুঁকিও রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া করা স্বল্পবিত্ত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন।
আইপিডির পর্যবেক্ষণ
বাস টার্মিনাল স্থানান্তর বিষয়ে আইপিডির পর্যবেক্ষণ ও মতামতগুলো হলো—
- সংযোগ পরিবহনব্যবস্থা বা ফিডার সার্ভিস এবং ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ সংকট: দূরপাল্লার যাত্রীরা শহরের প্রান্তের নতুন টার্মিনালে নামার পর যদি মূল শহরে পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত মেট্রোরেল, বিআরটি বা সুশৃঙ্খল লোকাল বাস না থাকে, তাহলে তারা চরম ভোগান্তিতে পড়বেন। রাতের বেলায় এ সমস্যা আরও প্রকট হবে।
- আর্থিক ব্যয় ও যাতায়াত সময় বৃদ্ধি: টার্মিনাল দূরে সরিয়ে নেওয়া হলে যাত্রীদের সিএনজি, অ্যাপভিত্তিক যানবাহন বা অন্যান্য পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে মূল শহরে প্রবেশ করতে হবে। এতে খরচ ও সময় দুটোই বাড়বে।
- যানজট বাড়ার আশঙ্কা: যাত্রীরা ছোট ছোট যানবাহনে মূল সড়কে আসা-যাওয়া করলে সড়কের ওপর চাপ বাড়বে। ফলে শহরের প্রবেশমুখ ও বিভিন্ন সড়কে যানজট আরও বাড়তে পারে।
- গণপরিবহনের ওপর অতিরিক্ত চাপ: ঢাকার অভ্যন্তরীণ বাসসেবা ও মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এ অবস্থায় প্রতিদিনের বিপুলসংখ্যক দূরপাল্লার যাত্রীর চাপ নগরের গণপরিবহনব্যবস্থা সামাল দিতে পারবে না।
- নিরাপত্তা ও নারী-শিশু-বয়স্কদের ভোগান্তি: প্রান্তিক টার্মিনালগুলো থেকে মূল শহরে প্রবেশের সংযোগ সড়ক নিরাপদ না হলে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ
আইপিডি বলছে, বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি হিসেবে শহরের প্রান্তে টার্মিনাল থাকার পরিকল্পনার কথা বলা হলেও গাবতলী, সায়দাবাদ ও গুলিস্তান একসময় ঢাকার প্রান্তবর্তী এলাকাই ছিল। নগর উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণের অভাবে ঢাকা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে এখন টার্মিনাল সরানোর কথা বলা হচ্ছে। বিবৃতিতে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাল, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন, ভারতের দিল্লির মহারানা প্রতাপ বাস স্টেশন ও কাশ্মীরি গেট বাস টার্মিনাল, বেঙ্গালুরুর কেম্পেগৌড়া বাস স্টেশন, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের কে এল সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল, পাকিস্তানের করাচির নুমায়েশ স্টেশন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি সেন্ট্রাল বাস স্টেশনের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। আইপিডির মতে, বিশ্বের অনেক শহরে কেন্দ্রীয় এলাকায় আন্তজেলা বাস টার্মিনাল রয়েছে এবং এসব টার্মিনাল শহরের জন্য উপকারী ভূমিকা পালন করে। এতে ছোট যানবাহনের ব্যবহার কমে, সড়কের চাপ হ্রাস পায় এবং মানুষের যাতায়াত সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হয়।
আইপিডির সুপারিশ
ঢাকার বাস টার্মিনাল ও পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে আইপিডির সুনির্দিষ্ট দাবি ও সুপারিশগুলো হলো—
- ঢাকার চারটি বাস টার্মিনাল সরানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।
- বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর আশপাশের অব্যবস্থাপনা দূর করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
- প্রস্তাবিত এলাকাগুলোতে বাস ডিপো নির্মাণ করে বর্তমান টার্মিনালের ওপর চাপ কমাতে হবে।
- দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য মানসম্মত ফিডার সার্ভিস চালু করতে হবে।
- বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
- টার্মিনালকেন্দ্রিক রুট পারমিট বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
- যাত্রীদের যাতায়াতপথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
- সমন্বিত টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে টার্মিনালগুলোকে মাল্টিমোডাল হাবে রূপান্তর করতে হবে।



