বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম বাচ্চু রহমান, বাবার ইউনিফর্মেই স্বপ্নের বীজ
বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম বাচ্চু রহমান, বাবার ইউনিফর্মেই স্বপ্ন

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার ৪৭তম ব্যাচে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন যশোরের কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের বাচ্চু রহমান। গত ২৮ জুন প্রকাশিত ফলাফলে দেশজুড়ে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। তার এই সাফল্যে পুরো গ্রামজুড়ে আনন্দের জোয়ার বইছে এবং দেশের লাখো তরুণের জন্য এটি হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার উৎস।

শৈশবের স্বপ্ন ও পথচলা

বাচ্চু রহমানের বাবা নজরুল ইসলাম আনসার বাহিনীর সদস্য। ছোটবেলা থেকে বাবার ইউনিফর্ম, বুট ও বেল্ট নিয়ে খেলতে খেলতেই তিনি পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। প্রথমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সৈনিক বা কনস্টেবল হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর সেই চেষ্টা করেননি।

২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হওয়ার সুযোগ আছে। তখনই তিনি স্থির করেন বিসিএস দিয়ে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেবেন। তবে পথটি সহজ ছিল না; ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতেই তিনি বাদ পড়েছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ার পরও তিনি পুলিশ ক্যাডারের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রস্তুতির কৌশল ও অনুপ্রেরণা

বাচ্চু রহমানের প্রস্তুতির পদ্ধতি অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষণীয়। কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের ছাত্র হওয়ায় তিনি মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে বিশ্বাস করতেন না; বরং বিষয়গুলো গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতেন। বিসিএসের প্রথাগত বইয়ের বাইরে তিনি নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা পড়তেন। ক্যাম্পাস জীবনে পত্রিকা পড়তে গিয়ে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক ও সাইবার অপরাধের চিত্র দেখে এসবের বিরুদ্ধে কাজ করার ইচ্ছা আরও দৃঢ় হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাচ্চুর মা বিলকিস বেগম বলেন, "কত অভাব অনটন, তার মধ্যেও ছেলেদের মানুষ করার চেষ্টা ছিল ওর বাবার। চাকরির টাকার প্রায় সব চলে যেত তাদের পড়াশোনা করাতে। ছোটবেলা থেকে বাচ্চু পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল না। জেএসসি পরীক্ষার পর স্কুলের পিকনিক থেকে ফিরে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ে। দিন কিংবা রাত বই নিয়ে ঘর, উঠান বা বাগানে পড়ত। অনেক সময় বই কেড়েও নিতে হয়েছে তার কাছ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ার সময় অনেক কষ্ট করেছে। তার এই কষ্ট সৃষ্টিকর্তা পুরস্কার দিয়েছেন।"

পুলিশ ক্যাডার বেছে নেওয়ার কারণ

বাচ্চু রহমান জানান, "শিক্ষকতা সম্মানজনক পেশা; কিন্তু আমার মনে হয়েছে পুলিশে থেকে মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার সুযোগ বেশি। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থেকেই পুলিশ ক্যাডার বেছে নিয়েছি। পদ বা পদবি নয়; একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই। মানুষ বিপদে পড়লে সাধারণত ডাক্তার বা পুলিশের কাছে যায়। এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই যাতে ভুক্তভোগী মানুষ পুলিশের প্রতি আস্থা পান। সততার সঙ্গে দেশের মানুষের জন্য কাজ করাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হবে।"

কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুস সবুর বলেন, "হাল না ছাড়ার জেদ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো ব্যর্থতাকে সাফল্যে রূপান্তর করা যায়, তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাচ্চু। ব্যর্থতার স্তূপ ডিঙিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা বাচ্চু রহমানের দেশসেবার এই কৃতিত্বে গর্বিত পুরো কেশবপুরবাসী। বাচ্চু ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত বিনয়ী ও মেধাবী ছিলেন। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে সঠিক কৌশল আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো বড় স্বপ্নই ছোঁয়া সম্ভব।"

শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরিবার

বাচ্চু রহমান কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষায় ২০১৫ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং স্থানীয় পাঁজিয়া মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। তিনি নজরুল ইসলাম ও বিলকিস বেগম দম্পতির দুই ছেলের মধ্যে ছোট। তার বড় ভাইও রয়েছে। বিসিএসের এই সাফল্য শুধু তার পরিবার নয়, পুরো এলাকার জন্য গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।