বরিশাল নগরীর অগ্রণী (আবাসন) হাউজিং লিমিটেডের কার্যালয়ে ঢুকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আজিজ হাওলাদারকে মারধর ও অণ্ডকোষ চেপে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর রবিবার (৫ জুলাই) দুপুরে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও তার সহযোগী আবুল কালামকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
ঘটনার বিবরণ
গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় নগরীর সদর রোডের অগ্রণী হাউজিং কোম্পানির কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এমডি আব্দুল আজিজ হাওলাদার তার অফিস কক্ষে বসে চা পান করার সময় চার থেকে পাঁচ জন ব্যক্তি ভেতরে ঢোকেন। সবাইকে বের করে দিয়ে কালো জামা পরিহিত এক ব্যক্তি আব্দুল আজিজকে জাপটে ধরেন এবং চড়থাপ্পড় মারাসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। পরে দুটি চেকে ও দুটি স্ট্যাম্পে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, এমডি আব্দুল আজিজ তার কক্ষে বসে চা পান করছিলেন এবং দুই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় চার জন যুবক কক্ষে প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে কালো জামা পরা মোস্তাফিজুর রহমান সবার শেষে কক্ষে ঢুকে প্রথমে সেখানে উপস্থিত অন্যদের বাইরে বের করে দেন। এরপর তিনি আব্দুল আজিজের কাছে গিয়ে হঠাৎ তাকে চেয়ারে বসা অবস্থায় জাপটে ধরেন। এতে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে আব্দুল আজিজ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে উপস্থিত আরেক ব্যক্তি তার পা টেনে ধরেন। পরে তিনি দাঁড়িয়ে গেলে মোস্তাফিজুর রহমান তাকে একাধিকবার চড় মারেন।
অণ্ডকোষ চেপে স্বাক্ষর নেওয়া
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, মারধরের একপর্যায়ে মোস্তাফিজুর রহমান আব্দুল আজিজের অণ্ডকোষ চেপে ধরেন। সেইসঙ্গে দুটি সাদা চেক ও দুটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিতে চাপ দেওয়া হয়। পরে আব্দুল আজিজকে ওই চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে দেখা যায়। ঘটনার সময় আব্দুল আজিজ ‘বাচ্চু, বাচ্চু’ বলে একজনকে ডাকতে শোনা যায়। কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করলে তাকে অল্প সময়ের জন্য আটকে রেখে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দেওয়া হয়। ভিডিওতে স্বাক্ষর নেওয়ার পর চেক ও স্ট্যাম্প গ্রহণের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করতে দেখা যায়। ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় মোস্তাফিজুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘হাসেন... হাসেন।’
ঘটনার পটভূমি
আব্দুল আজিজ জানান, একসময় তাদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিন বছর আগে বিনিয়োগের বিপরীতে তার মূলধন ও লভ্যাংশ হিসাব করে সমপরিমাণ জমি তাকে হস্তান্তরের মাধ্যমে হিসাব নিষ্পত্তি করা হয়। ওই সময় কোনও পাওনা নেই—এমন অঙ্গীকারনামাও দেন মোস্তাফিজুর রহমান।
আব্দুল আজিজের দাবি, গত কয়েক মাস ধরে মোস্তাফিজুর রহমান এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে সব ধরনের হিসাব আগেই চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় ওই অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মোস্তাফিজুর তার কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে অফিসে ঢুকে তাকে (আবদুল আজিজ) মারধর করেন এবং জোরপূর্বক ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক ও দুটি সাদা স্ট্যাম্পে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ঘটনার পর তিনি ব্যাংকে অভিযোগ করায় ওই চেক থেকে টাকা তুলতে পারেননি মোস্তাফিজুর রহমান।
আব্দুল আজিজের বক্তব্য
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদেছেন আব্দুল আজিজ। তিনি বলেন, ‘ওই সময় আমার অণ্ডকোষ এমনভাবে চেপে ধরেছে, শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এরপর আমাকে চেয়ার থেকে ফেলে দেয়। আমার বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে।’ পরে আবার কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বলেন, ‘আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল এবং বলেছিল আমাদের চেক দেন। ওই অবস্থায় জীবন বাঁচাতে সাদা চেক ও দুটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিয়েছি।’
এই ঘটনায় তিনি গত বৃহস্পতিবার বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন। বিচারক এস এম শরিয়ত উল্লাহ মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের জন্য কোতোয়ালি মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
অভিযুক্ত মোস্তাফিজুরের বক্তব্য
গ্রেফতারের আগে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আব্দুল আজিজের কাছে আমার পাওনা রয়েছে ৫০ লাখ টাকার ওপরে। এ টাকা নিয়ে বছরের পর বছর টালবাহানা করছেন তিনি। একাধিক সালিশ বৈঠক হলেও আজিজ একটি টাকাও দেননি। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই দলের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে তিনি বহু লোকের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তাকে বারবার টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তাগিদ দেওয়া হলেও ফেরত দেননি। প্রতিবারই তার একটি জবাব, “হাতে টাকা আসলে ফেরত দেবো।” এই টাকা নিয়ে আমার রাতের ঘুমও হারাম হয়ে গেছে। কোনও উপায়ান্তর না পেয়ে আমি তার অফিসে গিয়ে প্রথমে নরম সুরে টাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চাই। তিনি কোনও উত্তর না দিয়ে গড়িমসি করতে থাকেন। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে আমি তাকে লাঞ্ছিত করেছি, তা মিথ্যা নয়।’
লিটু বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিসি ক্যামেরার যে ফুটেজটি ঘুরপাক খাচ্ছে সেটি ভালো করে দেখেন, সেখানে তার পক্ষে কেউ কিছু লিখেছে কিনা। আমার অন্যায় হয়েছে, তার অফিসে গিয়ে এ ধরনের আচরণ করা। কিন্তু ভূমিদস্যু ও প্রতারক আজিজের খপ্পরে পড়ে অগণিত মানুষ লাখ লাখ টাকা খুইয়েছেন।’
পুলিশের বক্তব্য
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) পুলিশ কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বাংলা ট্রিবিউন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আমাদের মিডিয়া সেলকে বিষয়টি জানানো হয়। একইসঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থা ও কোতোয়ালি থানা পুলিশকে মাঠে নামিয়ে আজ রবিবার দুপুরে লিটুসহ দুজনকে গ্রেফতার। তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ইমদাদ হুসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি পুলিশ কমিশনার জানার সঙ্গে সঙ্গে কোতোয়ালি থানা পুলিশকে জানানো হয়। এরপর অভিযান চালিয়ে ওই দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।’



