মিথ্যা মামলায় হয়রানি: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিরীহদের গ্রেপ্তার ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মিথ্যা মামলায় নিরীহদের হয়রানি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মিথ্যা মামলায় নিরীহদের গ্রেপ্তার: চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ

ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর মনোয়ারা হাসপাতালে স্ত্রী ও নবজাতক কন্যাশিশুর পাশে থাকা অবস্থায় গত বছরের ৫ মে গ্রেপ্তার হন ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন প্রধানীয়া (৪৮)। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাঁকে ভাটারা থানার মো. রিয়াজ হত্যা মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করে। গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, প্রধানীয়ার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার হত্যা মামলা রয়েছে। সেখানে তাঁর পরিচয় দেওয়া হয় রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।

মামলার জটিলতা ও জামিনের পর নতুন গ্রেপ্তার

ঢাকার আদালতের খোঁজে জানা যায়, গত বছরের ১৮ জুন রিয়াজ হত্যা মামলায় জামিন পান প্রধানীয়া। তবে সেদিনই ভাটারা থানার আরেকটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। নতুন মামলায় তাঁর পরিচয় লেখা হয় কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। মজার বিষয় হলো, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় বা থানা—কোনো কমিটিতেই ইসমাইল প্রধানীয়ার নাম নেই।

ইসমাইল প্রধানীয়া সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিথ্যা মামলায় পড়ে আমার জীবন, পরিবার তছনছ হওয়ার মতো অবস্থা। এখনো মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, কেবল ভাটারা থানা নয়, যাত্রাবাড়ী, পল্টন, কোতোয়ালি ও আশুলিয়া থানায় গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাসংক্রান্ত আরও পাঁচটি মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অনুসন্ধানে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ১০০টি মামলার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মামলাগুলোতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের পাশাপাশি অনেক সাধারণ বা বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষকে ঢালাও বা হয়রানিমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে। এমন ব্যক্তিদের আসামি করার পেছনে ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক বা পেশাগত দ্বন্দ্ব, সম্পদ দখল, চাঁদাবাজি, মামলা-বাণিজ্য বা প্রতিহিংসাজনিত কারণও পাওয়া গেছে।

প্রথম আলোর কাছে অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগী বলেছেন, মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে তাঁদের ঘুষ দিতে হয়েছে। ৩২ জন বাদী স্বীকার করেছেন, তাঁরা চেনেন না এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করেছেন। অনেক বাদী পরে আদালতে হলফনামা দিয়ে বলেছেন, ভুলবশত আসামি করা হয়েছে। অন্তত ৪৭টি মামলায় ছয় শতাধিক আসামির নাম বাদ দিতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের তথ্য রয়েছে।

এক ঘটনায় তিন মামলা: নেপথ্যের কাহিনী

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ রিয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘যখন সত্যিকারের অপরাধীদের পরিবর্তে নিরীহ মানুষকে মামলায় আসামি বা গ্রেপ্তারের কথা শুনি, খারাপ লাগে। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীরা ছাড়া না পাক এবং নিরীহ কেউ হয়রানির শিকার না হোক।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে রিয়াজের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় গত বছর যাত্রাবাড়ী ও ফতুল্লায় দুটি মামলা হয়েছিল। একই ঘটনায় তৃতীয় মামলা হয় ভাটারা থানায়, যে মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ইসমাইল প্রধানীয়া ১০৯ দিন জেল খাটেন। যদিও একটি ঘটনায় তিনটি মামলা হওয়ার সুযোগ নেই।

ভাটারা থানার মামলার বাদী জাহিদুল ইসলামের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগেরও সত্যতা পাওয়া যায়নি। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, জাহিদুলের বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ বিভিন্ন থানায় সাতটি মামলা রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এ রকম একজন ব্যক্তির করা মামলায় একজন ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কেন এত উদ্যোগী হলো।

ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও চাঁদাবাজির অভিযোগ

ইসমাইল প্রধানীয়ার মতে, তাঁর বিরুদ্ধে মামলার পেছনে রয়েছেন নাসির উদ্দিন ওরফে দুলাল নামের এক ব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে মৌচাকের ফরচুন শপিং মল ও অ্যাপার্টমেন্টকে কেন্দ্র করে পুরোনো দ্বন্দ্ব রয়েছে। প্রধানীয়া এই শপিং মল দোকান মালিক সমিতি এবং অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এই মালিক সমিতির ১১ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অন্তত ২৮টি মামলা দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, নাসির উদ্দিন এই ক্ষেত্রে যে মামলাবাজ চক্রকে ব্যবহার করেছেন, তাঁর নেতৃত্বে রয়েছেন সাইফুল ইসলাম বাহার নামের এক ব্যক্তি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফুল ইসলাম বাহার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, এগুলো মিথ্যা। নাসির উদ্দিনকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। তবে তাঁর কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই।

জমি নিয়ে দ্বন্দ্বে নিরীহ মালিকদের মামলায় ফাঁসানো

জুলাই শহীদ তালিকায় নাম রয়েছে কাজী আশরাফ আহমেদ রিয়াজের। তাঁকে হত্যার ঘটনায় ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হয় গত বছরের ২ জুলাই। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আসামি করা হয়েছে আরও ৯৪ জনকে। এঁদের মধ্যে পাঁচটি নাম কৌতূহলোদ্দীপক। এই ব্যক্তিরা কালশী সড়কের পার্শ্ববর্তী জোয়ারসাহারার একটি জমির যৌথ মালিক।

মামলার বিষয়ে পুলিশের কাছে দেওয়া এক আবেদনে এই পাঁচ ব্যক্তি জানান, তাঁদের জমিটি সড়কসংলগ্ন। পাশের আরেকটি জমির মালিক মাসুদ আলী গং। জমিটিতে বহুতল আবাসন ভবন নির্মাণের জন্য মাসুদ আলীরা একটি আবাসন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। তবে কনডোমিনিয়াম নির্মাণের জন্য সড়কসংলগ্ন পাঁচ ব্যক্তির জমিটিও প্রয়োজন। তাঁদের অভিযোগ, মাসুদ আলীরা কয়েক দফা তাঁদের জমি দখলের চেষ্টা করেছেন। তাতে ব্যর্থ হয়ে জুলাই হত্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ

দেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজারে সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান আহমেদ ফুড প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ আহমেদ বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) কোষাধ্যক্ষ। গত বছরের ১৬ জুন বাপার ইফতার মাহফিল ও বার্ষিক সাধারণ সভা থেকে তাঁকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। মিনহাজের সঙ্গে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এবং মেসার্স আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানির মালিক মো. ইকতাদুল হককেও গ্রেপ্তার করা হয়। এই দুজনসহ তাঁদের সংগঠনের সদস্য মোট ৯ জন ব্যবসায়ীকে যাত্রাবাড়ী থানার মো. মাহাদী হাসান (পান্থ) হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।

মিনহাজের মা এবং আহমেদ ফুডস প্রোডাক্টসের চেয়ারম্যান সুরাইয়া আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে পরাজিতরা শত্রুতাবশত পুরো প্যানেলকে জুলাই হত্যা মামলায় আসামি করিয়েছে।’

পুলিশ ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা

পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও পরিচালন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম ৮ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাকেন্দ্রিক কিছু মামলায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে বা ভুলভাবে আসামি করার ঘটনা পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল মিথ্যা দেখানো হয়েছে। পর্যালোচনা করে যেগুলোর সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলোতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে নতুন মামলাও নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ১০টি তদারকি দল সারা দেশের মামলাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য মো. নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলাগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি। সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে এসব মামলার পর্যালোচনা করা। কারণ, সারা দেশের হাজার হাজার মানুষ মামলার শিকার। অনেকে এখনো ঘরে থাকতে পারছেন না, কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। তাই দ্রুত যাচাই–বাছাই করে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’

গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। মামলা–বাণিজ্যের প্রতিকারে সরকার ও পুলিশ কিছু কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তারপরও দেখা যাচ্ছে হয়রানি চলছে। নিরীহ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।