বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সাংবাদিকদের জামিন ও হয়রানির প্রসঙ্গ
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সাংবাদিকদের জামিন ও হয়রানি

আজ রোববার বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হচ্ছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবন্দী রয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিক। বারবার আবেদন করেও তাঁরা জামিন পাচ্ছেন না। এ ছাড়া মামলার কারণে কেউ কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন জামিন পাওয়ার আশা দেখছেন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিকেরা।

জুলাই অভ্যুত্থানের মামলায় আটক সাংবাদিকেরা

২০২৪ সালের ২১ আগস্ট একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক-উপস্থাপক ফারজানা রুপাকে বিদেশযাত্রার সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ আটক করে। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় উত্তরা ও আদাবরে হত্যা মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তাঁরা কারাগারে আছেন, এখনো জামিন পাননি।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে আটক হন একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু এবং ভোরের কাগজ-এর সম্পাদক শ্যামল দত্ত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হওয়া কয়েকটি হত্যা মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তখন থেকে তাঁরা কারাগারে আছেন এবং জামিন আবেদন একাধিকবার নাকচ হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত বছরের ডিসেম্বরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হন জাতীয় প্রেসক্লাব ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি এবং জনতা পার্টি বাংলাদেশের মহাসচিব শওকত মাহমুদ। তিনি বর্তমানে কারাগারে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় গত বছরের আগস্টে মাইটিভির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঢালাও আসামি ও জামিনের আশা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বঙ্গভবনের প্রধান ফটকের সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন। তিনি সেখান থেকে লাইভ সম্প্রচার করেন। কিন্তু একই দিন বিকেলে মিরপুরের ভাষানটেক এলাকায় এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তাঁকেও আসামি করা হয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।

নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৪ মার্চ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর জামিন পেয়েছেন। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছিল। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ জামাল হোসাইন। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

গত বছরের আগস্টে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম (পান্না)। মাস তিনেক পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

চট্টগ্রামে ২৮ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এসব ঘটনায় অন্যদের মধ্যেও কিছুটা আশাবাদ সঞ্চার হয়েছে।

সাংবাদিকদের নির্যাতনের চিত্র

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চ—এই ১২ মাসে বাংলাদেশে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি সাংবাদিকদের নির্যাতন বা হয়রানি করেছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা–কর্মীরা। এর মধ্যে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে চারজন সাংবাদিকের। এই সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১৯টি।

দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারা দেশে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। এর মধ্যে ২৬৬ জনকে অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত হত্যা বা সহিংসতার মামলায় আসামি করা হয়।

প্রতিক্রিয়া ও প্রশ্ন

নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যদি আইনের শাসনের কথা বলি, তাহলে বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা এবং দিনের পর দিন জামিন না দেওয়া সমীচীন নয়। বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। আমরা নোয়াবের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি বলেছি। শিগগিরই বিষয়টির সুরাহা হবে বলে আশা রাখছি।’

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এসব মামলা সরকার করছে না; সাধারণ মানুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে মামলা করছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, গ্রেপ্তার করা, জামিন না হওয়া এবং দীর্ঘ কারাবাসের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকায় রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে কি না।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলো সংবেদনশীল। তদন্তকারী সংস্থাগুলো প্রতিটি মামলা যাচাই-বাছাই করে দেখছে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে দায় পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করছেন। আর কারও বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে।

সাংবাদিকদের অনেকে বলছেন, সাংবাদিকেরা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। তাঁদের লেখালেখি বা বক্তব্যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত মনে করলে তার আইনি প্রতিকার রয়েছে। কিন্তু ঢালাওভাবে হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগে নাম ধরে ধরে আসামি করা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিন দফায় ১৬৭ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। পরে সমালোচনার মুখে নির্ধারিত সংখ্যক সাংবাদিকের তালিকা করা হয়। তবে নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন সাড়ে চার মাসেও হয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন: মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার’।