সরকার আর্থিক ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে অতিরিক্ত সচিব ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য আকাশপথে বিদেশ ভ্রমণে সুলভ শ্রেণি (ইকোনমি ক্লাস) বাধ্যতামূলক করেছে। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি অফিস স্মারক জারি করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশনার মূল বিষয়
অর্থ বিভাগের অফিস স্মারকে বলা হয়েছে, সরকারের অতিরিক্ত সচিব, সমপর্যায়ের সরকারি, স্বশাসিত, সংবিধিবদ্ধ, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এখন থেকে বিদেশ ভ্রমণে আকাশপথে ইকোনমি ক্লাসে যাতায়াত করবেন। এর আগে এই পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিজনেস, ক্লাব বা এক্সিকিউটিভ শ্রেণিতে ভ্রমণের সুযোগ পেতেন।
অফিস স্মারকটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে সচিবদের জন্য কোনো ব্যয়সাশ্রয়ী পদক্ষেপ এই স্মারকে উল্লেখ করা হয়নি।
ভ্রমণ ভাতা ও শ্রেণিবিন্যাস
২০১২ সালের ৯ অক্টোবর অর্থ বিভাগের জারি করা একটি আদেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে সব স্তরের সরকারি কর্মচারীদের প্রাপ্য সুবিধা নির্ধারিত হয়, যা এখনও বহাল রয়েছে। এই আদেশ অনুযায়ী সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা পদমর্যাদা অনুযায়ী ভ্রমণ ভাতা পান। হোটেল ভাড়া, যাতায়াত, খাবারসহ অন্যান্য ব্যয় মার্কিন ডলারে পরিশোধ করা হয়। ভাতা নির্ধারণে ‘বিশেষ পর্যায়’ ও ‘সাধারণ পর্যায়’—এই দুটি শ্রেণি রয়েছে। পাশাপাশি দেশভেদে গ্রুপ-১, গ্রুপ-২ ও গ্রুপ-৩—এই তিনটি শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে।
- গ্রুপ-১: ৩০টি দেশ, যার মধ্যে রয়েছে জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, হংকং, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরান, কুয়েত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, মেক্সিকো, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি, সুইডেন, জার্মানি, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, স্পেন ও তুরস্ক। এ ছাড়া ইউরোপ, ওশেনিয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশও এই গ্রুপের আওতাভুক্ত।
- গ্রুপ-২: ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, মালদ্বীপ, উজবেকিস্তান, জর্ডান, ইরাক, লেবানন, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কেনিয়া, মরিশাস, সুদান, সিয়েরা লিওন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, লিবিয়া ও মরক্কো। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও এই গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত।
- গ্রুপ-৩: নেপাল, ভিয়েতনাম, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশ।
অতিরিক্ত সচিবদের সংখ্যা ও ভাতা
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫০০ জন অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন। সমমর্যাদার পদ বিবেচনায় এ সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে যায়। বিদেশ সফরে গেলে অতিরিক্ত সচিবরা বৈদেশিক মুদ্রায় (মার্কিন ডলার) দৈনিক ভাতা পান। উচ্চ ব্যয়বহুল দেশে (যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের দেশ) ভাতা সর্বোচ্চ ৪০০ ডলার, মাঝারি ব্যয়বহুল দেশে সর্বোচ্চ ৩০০ ডলার এবং কম ব্যয়বহুল দেশে সর্বোচ্চ ২৫০ ডলার পর্যন্ত নির্ধারিত। এই ভাতা খাবার, স্থানীয় যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হয়।
পূর্ববর্তী সাশ্রয়ী পদক্ষেপ
এর আগে ২০২৩ সালের মে মাসে অর্থ বিভাগ সরকারি খরচে আকাশপথে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ব্যয় সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেয়। সে সময় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতিসহ মন্ত্রীদের জন্য প্রথম শ্রেণিতে ভ্রমণের সুবিধা বাতিল করে তা বিজনেস, ক্লাব বা এক্সিকিউটিভ শ্রেণিতে নামিয়ে আনা হয়। বর্তমান পদক্ষেপটি সেই ধারাবাহিকতায় নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।



