পল্লবী শিশুহত্যা: দ্রুত বিচার হলেও আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন
পল্লবী শিশুহত্যা: দ্রুত বিচার হলেও আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন

রাজধানীর পল্লবীর শিশুহত্যার ঘটনাটি ছিল ভয়াবহ। এ ঘটনায় দেশবাসী স্তম্ভিত হয়েছেন এবং দ্রুত বিচারের দাবি করেছেন। এমন দাবি করাই যৌক্তিক। কারণ তাঁরা দেখছেন, বিভিন্ন নৃশংস হত্যাকাণ্ড, বিশেষ করে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় তদন্ত ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা থাকে। পল্লবীর ঘটনায় ১৯ দিনের মাথায় বিচার সম্পন্ন হওয়ায় ভুক্তভোগীর পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করেছে। ব্যতিক্রমভাবে আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবীও রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

দ্রুত বিচার: প্রশংসা ও উদ্বেগ

পল্লবীর এই শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিকে যেন আমরা আলাদাভাবে না দেখি। এ ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ভুক্তভোগীর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হয়েছে, সরাসরি যোগাযোগ করা হয়েছে। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সব ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সরাসরি না গেলেও অন্তত যেন খোঁজ রাখা হয় ও সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এটাই প্রয়োজন। আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রত্যেক ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে হবে।

তবে পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে যেভাবে তদন্ত ও বিচার হয়েছে, তা বিচারিক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেটাও পর্যবেক্ষণ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, পাবলিক সেন্টিমেন্ট (জনগণের মনোভাব) মাথায় রেখে অতি দ্রুত তদন্ত ও বিচার করা হয়েছে। আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ না থাকলে তা বিচারের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনি প্রক্রিয়া ও স্বাধীন বিচার

আইনি কিছু প্রক্রিয়া আছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে তা যথাযথ অনুসরণ করার প্রয়োজন হয়। সামাজিক চাপে অতি দ্রুত যদি তদন্ত ও বিচার হয়, যদি তদন্ত ও বিচারে জড়িত ব্যক্তিরা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না পান, তবে বিচারে প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি জনমতের চাপে যদি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচারের প্রতি কোনো প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়, সেটাও বিচারে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই যেকোনো ঘটনায় ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে তদন্ত ও বিচারকে প্রভাবিত করা যাবে না।

আপিল ও ডেথ রেফারেন্স

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রায়ের পর এক ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেও বলেছেন, নিম্ন আদালত কোনো মামলায় রায় দিলেও আপিল শুনানিতে বিলম্ব ঘটার কারণে সে রায় কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি গতকাল উন্মুক্ত আদালতে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে আনেন। তখন প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল) শুনতে সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠনের কথা বলেন। আমরা আশা করি, সেখানে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে এবং আপিলের সময়ে দীর্ঘসূত্রতা কমে আসবে।

মৃত্যুদণ্ড ও শাস্তির মানদণ্ড

আসামিদের ক্ষেত্রেও উপযুক্ত শাস্তি হতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডে বিশ্বাসী নই। কারণ, কোনো ঘটনায় অন্যায়ভাবে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না, এটা নিয়ে আমরা নিশ্চিত নই। মৃত্যুদণ্ড কোন পর্যায়ে কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে অপরাধে যদি শিশুর সংশ্লিষ্টতা থাকে, মানসিকভাবে অসুস্থ কেউ জড়িত থাকেন, তাহলে মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত নয়।

পল্লবীর শিশু হত্যাকাণ্ডের রায়ের ক্ষেত্রে সোহেলের স্ত্রীকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ধর্ষণ ও হত্যায় সহযোগিতা করার কারণে। এই শাস্তি পর্যাপ্ত নাকি অতিরিক্ত হলো, সেই আলোচনা হয়তো আপিলের সময় হবে। সব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজা হবে কি না, সেটার একটি নির্দেশিকা থাকা দরকার। কোন ধরনের অপরাধে কী সাজা হবে, সেটার মানদণ্ড না থাকলে তা বিচারব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।

সুশাসন ও ন্যায়বিচার

সুশাসন চাইলে জনমত ও আবেগ দিয়ে আদালতকে প্রভাবিত করা যাবে না। সুবিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়াকে শক্ত করতে হবে। ভুক্তভোগীর চরিত্র হনন করা যাবে না। ভুক্তভোগী, ভুক্তভোগীর পরিবার ও সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।