ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক ১১টা। এজলাসে জুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীর সরগরম অবস্থা। ঠিক সময়ে এজলাসে আগে থেকে দাঁড়ানো অবস্থায় বিচারকের ব্যক্তিগত সহকারী সবাই থামিয়ে সুরে টান দিয়ে ঘোষণা করলেন ‘বিচারক আসছেন’। সঙ্গেসঙ্গেই বিচারক এসে এজলাসে তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে এসে বসেন।
রবিবার (৭ জুন) রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হয়। দিনের কার্যক্রমের সূচনা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনি আদালতকে বলেন, ‘আজ মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য নির্ধারিত আছে। আমরা প্রস্তুত আছি।’ এসময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘রায় ঘোষণা করতে আমি প্রস্তুত’। বলেই তিনি রায় পড়া শুরু করেন।
রায় ঘোষণা উপলক্ষে আদালতের এজলাস ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু, আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ, মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী, রামিসার পিতা আব্দুল হান্নান মোল্লা, সাধারণ আইনজীবী ও মিডিয়াকর্মীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন রায় শোনার জন্য।
মামলার দুই আসামি সোহেল রানাকে পৌনে ১১টায় ও স্বপ্না আক্তারকে ১০টা ৫৫ মিনিটে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ হাজতখানা থেকে আদালতে নেওয়ার পথে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আসামিদের সামনে দিকে ৫০ এবং পেছনে ৫০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
এজলাসে তোলার পর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আইনজীবীরা তাদের ‘খুনি খুনি’ বলে দুয়োধ্বনি দেয়। অনেকে গালাগালিও করেন। আসামি কাঠগড়ায় সোহেল রানাকে হেলমেট পরিয়ে হাত পেছনে করে হাতকড়া লাগানো ছিল। স্বপ্নার হাতকড়া না থাকলেও মাথায় নিরাপত্তা হেলমেট পরানো ছিল।
বিচারক রায় পড়া শুরুর পর এজলাসে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। রায় পড়ার পুরো সময় রামিসার বাবা মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। এসময় আলোচিত এই হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাও কাঠগড়ায় নির্বিকার দাঁড়িয়ে ছিলেন। রায় ঘোষণার আগে থেকেই তাকে বিড়বিড় করতে দেখা যায়। কাছাকাছি থাকা আইনজীবীরা বলছেন, এসময় আসামি সোহেল দোয়া-দরুদ পড়ছিল। তাকে কখনো কখনো দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াতেও দেখা যায়। তবে তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি। রায় ঘোষণার পর তাকে পানি পান করতেও দেখা যায়। আরেক আসামি স্বপ্না আক্তারকে কাঠগড়ায় একটি প্লাস্টিকের টুলে বসানো হয়। তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। কখনো কখনো তাকে চোখ মুছতেও দেখা গেছে।
সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে ফাঁসির রায় ঘোষণা করলে হাততালি দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন এজলাস ও এজলাসের বাইরে থাকা সাধারণ আইনজীবীরা। রায় ঘোষণা শেষে সাজা পরোয়ানা দিয়ে আবারও তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে নেওয়ার সময়ও পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে দিয়ে প্রিজনভ্যানে ওঠানো হয়।
আদালত রায়ে আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পাশাপাশি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়। এই টাকা আদায় করে রামিসার উত্তরাধিকারীদের প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রয়োজনে সোহেল রানা ও স্বপ্নার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই টাকা রামিসার পরিবারকে বুঝিয়ে দিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।
পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর পর মাত্র ৫ কার্যদিবসে রায় ঘোষণা করলেন আদালত। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ে এই রায় ঘোষণা করা এটাই প্রথম।



