রাজবাড়ীর পাংশায় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পড়া না পারায় অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করে জখমের অভিযোগ উঠেছে ওই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্ত শিক্ষককে প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন। ভুক্তভোগীর পরিবারসহ এলাকাবাসী শিক্ষকের অব্যাহতি দাবি করেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল মঙ্গলবার উপজেলার মৌরাট ইউনিয়নের বাগদুলী উচ্চবিদ্যালয়ে।
অভিযুক্ত শিক্ষক ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী
অভিযুক্ত আবদুল আহাদ খান ওই বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞানবিষয়ক শিক্ষক ও মৃগী ইউনিয়নের খরখরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। এনটিআরসির মাধ্যমে ২০১৯ সালে বিদ্যালয়টিতে যোগদান করেন। আহত শিক্ষার্থী স্থানীয় মালঞ্চি গ্রামের মুন্সী জাহিদুল ইসলামের ছেলে। তাঁকে পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক আবদুল আহাদ খান শিক্ষার্থীদের পড়া ধরেন। পড়া না পারায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করেন। এ সময় শিক্ষকের সঙ্গে অসদাচরণ করার অভিযোগে এক শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করার পাশাপাশি লাথি মেরে মেঝেতে ফেলে দেন। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় ও পরিবারের লোকজন বিদ্যালয়ে জড়ো হন। তাঁরা শিক্ষকের শাস্তির দাবি জানালে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রধান শিক্ষক ওই শিক্ষককে বিদ্যালয়ের পাঠাগারে (লাইব্রেরি) আটকে রাখেন। তাৎক্ষণিক শিক্ষককে ঘটনার উপযুক্ত কারণ দর্শানোসহ শাস্তির আশ্বাস দিলে প্রায় দুই ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ভুক্তভোগীর বাবার বক্তব্য
ওই শিক্ষার্থীর বাবা মুন্সী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুরে খবর পেয়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি আমার ছেলের পিঠে যতগুলো আঘাত করা হয়েছে প্রতিটি আঘাতের স্থান ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। কোনো অন্যায় করলে আমাকে ডেকে আনতে পারতেন, অভিযোগ দিতে পারতেন। প্রয়োজনে বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র দিয়ে বের করে দিতেন। পরে ছেলেকে পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা স্কিন বিশেষজ্ঞ দেখাতে পরামর্শ দিলে পরে ফরিদপুর পাঠানো হয়।’
জাহিদুল ইসলামের দাবি, অভিভাবক কমিটির সাবেক সদস্য হওয়ায় বিদ্যালয়ের সবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো। তিনি বলেন, ‘পড়া না পারার অজুহাতে আমার ছেলের ওপর এভাবে নির্যাতন করা হবে মেনে নিতে পারছি না। এটাকে কি শাসন বলে, নাকি শিক্ষকের নৈতিক অবক্ষয়। যেখানে অন্যান্য শিক্ষার্থীকে দুইটা করে বেতের বাড়ি দেন সেখানে আমার ছেলেকে বেত্রাঘাত করে ফ্লোরে ফেলে উপর্যুপরি লাথি মারতে থাকেন। তিনি শিক্ষকতা করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। তাঁর অব্যহতি দাবি করছি।’
অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক আবদুল আহাদ খানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও ধরেননি। তবে গতকাল স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তিনি দাবি করেন, ওই শিক্ষার্থীকে পড়া ধরলে না পারায় শাসন করেছেন। এ সময় ওই শিক্ষার্থী বেয়াদবি করে মা-বাপ তুলে গালি দিলে তিনি মেজাজ হারিয়ে ফেলেন। বিষয়টি নিয়ে অনুতপ্ত বলে জানান ওই শিক্ষার্থী।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল খালেক বলেন, ‘শুনেছি পড়া না পারায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করেন ওই শিক্ষক। এ সময় এক ছাত্র শিক্ষকের হাত থেকে বেত ধরে মা-বাপ তুলে গালমন্দ করে। এতে উত্তেজিত হয়ে শিক্ষক আরও বেশি আঘাত করেন। তবে এভাবে আঘাত করা ঠিক হয়নি। ওই শিক্ষককে উপযুক্ত কারণ দর্শাতে সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও ইউএনওকে অবগত করা হয়েছে।’
প্রশাসনের পদক্ষেপ
পাংশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রিফাতুল হক জানান, ‘প্রাথমিকভাবে জেনেছি ক্লাসে পড়াশোনা না পারায় শিক্ষার্থীদের বকাঝকা করছিলেন ওই শিক্ষক। এ সময় এক শিক্ষার্থী মা-বাপ তুলে গালি দেওয়ায় মাথা ঠিক রাখতে না পেরে তাকে বেদম প্রহার করেন শিক্ষক। অভিভাবকসহ শিক্ষার্থী, অভিযুক্ত শিক্ষক, প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীকে ডেকেছি। এ বিষয়ে শুনানি শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’



