নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় গত দুই সপ্তাহে প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি, গুলি ও অপহরণের চেষ্টার তিনটি ঘটনা ঘটলেও মূল অভিযুক্ত ও তার সহযোগীরা এখনও গ্রেপ্তার হননি। ভিডিও চিত্রে প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীদের ছবি আসার পরও তারা আইনের আওতায় না আসায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে এবং উদ্বেগ বাড়ছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
প্রথম ঘটনা: রাজমিস্ত্রি ফারুক হোসেনকে গুলি
৯ জুন সকাল আটটার দিকে উপজেলার হাজীপুর ও শরীফপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কালামিয়ার দোকান নামক স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন মো. ফারুক হোসেন নামের এক রাজমিস্ত্রি। হঠাৎ একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ছয় থেকে সাতজন যুবক আসে। তাদের একজন পিস্তল হাতে নেমে সহযোগীসহ ফারুককে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। অনেক চেষ্টার পরও ফারুককে অটোরিকশায় তুলতে না পেরে শেষে তার পায়ে ও কোমরে গুলি করে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।
ঘটনার ভিডিও চিত্র পরে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অস্ত্রধারী ওই ব্যক্তি স্থানীয় যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় মামলায় পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালেও অস্ত্রধারী ও তার বাকি সহযোগীরা পলাতক রয়েছে।
দ্বিতীয় ঘটনা: যুবকের কাছ থেকে পিস্তল উদ্ধার
একই দিন দুপুরে বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বেতুয়াবাগ বাজারে মো. তুহিন (২৫) নামের এক যুবক ঘোরাফেরা করছিলেন। স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হলে তারা তাকে আটক করার চেষ্টা করে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে যুবক একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও চারটি গুলি ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরে জানা যায়, পূর্ববিরোধের জেরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তুহিন স্থানীয় জাহাঙ্গীর ও হান্নান নামের দুই ব্যক্তিকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও আঘাতের চেষ্টা করছিলেন।
তৃতীয় ঘটনা: তিন পিস্তলসহ গ্রেপ্তার
৮ জুন বিকেলে গোপালপুর ইউনিয়নে আবদুর রহমান ওরফে রাহিম (২১) নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কোমরে গুঁজে রাখা তিনটি বিদেশি পিস্তল, আটটি গুলি ও তিনটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার রাহিম উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বসন্তবাগ গ্রামের জসিম উদ্দিনের ছেলে। তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে উপজেলা বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। রাহিম উদ্ধার হওয়া অস্ত্র নিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন এবং আরও কয়েকজনের নাম বলেন, তবে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ
হাজীপুর-শরীফপুর সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, “বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেগমগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরি হয়েছিল। ওই গ্রুপগুলোর নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন এবং বর্তমানে যাঁরা আছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ কারণে অস্ত্রবাজি করে কখনো পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও তাঁদের খুব বেশি সময় জেলে থাকতে হয় না। ধরা পড়ার পর অল্প কিছু দিন গেলে জামিনে বেরিয়ে আসেন এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।”
পুলিশের বক্তব্য
বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শামসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, “হাজীপুর-শরীফপুর সীমানায় রাজমিস্ত্রিকে গুলি করার ঘটনায় থানায় সাতজনকে আসামি করে একটি মামলা হয়েছে। মামলায় এরই মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে যিনি গুলি করেছেন, তাঁকে শনাক্ত করা গেলেও এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া অস্ত্র রেখে পালিয়ে যাওয়া অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আর তিনটি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার তরুণের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তির আলোকে ওই অস্ত্রগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, “উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি জেলার বেগমগঞ্জসহ অন্য উপজেলাগুলোতে অবৈধ অস্ত্রধারীদের তালিকা তৈরি করে তাদেরও আইনের আওতায় আনার কাজ চলমান।”



