রাষ্ট্রমালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর টেলিটকের কাছে তরঙ্গ, লাইসেন্স ফি ও মাশুল বাবদ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পাওনা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। বছরের পর বছর সেই অর্থ পরিশোধ না করলেও নতুন করে আরও ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ পাচ্ছে অপারেটরটি। বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের এই তরঙ্গ টেলিটককে বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অথচ একই ব্যান্ডের তরঙ্গ কিনতে গিয়ে উচ্চমূল্যের অভিযোগ তুলে নিলাম থেকেই সরে দাঁড়িয়েছিল বেসরকারি অপারেটর রবি ও বাংলালিংক।
খাতসংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেলিটকের ক্ষেত্রে নিয়ম ভিন্নভাবে প্রয়োগ হয়। নিলামে অংশ নিয়ে তরঙ্গ নিলেও দাম পরিশোধ না করা, লাইসেন্স ফি বকেয়া রাখা, এ ছাড়া রাজস্ব ভাগাভাগির নিয়ম থাকলেও তা মানে না অপারেটরটি। বিটিআরসি যেন টেলিটকের জন্য ‘মামাবাড়ি’। এবার সেই ‘মামাবাড়ির আবদারে’ যোগ হচ্ছে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের মূল্যবান তরঙ্গ।
তরঙ্গের মূল্য ও শর্ত
বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৫ বছরের জন্য প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের মূল্য ধরা হয়েছে ২৩৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের মোট মূল্য দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এই অর্থ সরাসরি পরিশোধ করতে হবে না টেলিটককে; বরং মূল্য ‘ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করবে সরকার। অর্থাৎ বকেয়া অর্থকে ফেরতযোগ্য ঋণ হিসেবে না দেখে সরকারের মালিকানার অংশে রূপান্তর করা হবে। এ ছাড়া তরঙ্গ বরাদ্দের পূর্বশর্ত হিসেবে মোট চার্জের প্রথম কিস্তির ১০ শতাংশ অর্থও সরকারের ‘ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট’ হিসেবেই গণ্য হবে। তরঙ্গ বরাদ্দ কার্যকর থাকবে টেলিটকের বিদ্যমান সেলুলার মোবাইল সার্ভিস অপারেটর লাইসেন্সের মেয়াদ পর্যন্ত, অর্থাৎ ২০৩৯ সাল পর্যন্ত।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার টেলিটকের বকেয়াকে “ইকুইটি ইনভেস্টমেন্টে” রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই ভিত্তিতেই টেলিটককে নতুন তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।’
অবশিষ্ট থাকছে ৫ মেগাহার্টজ
বিস্তৃত এলাকায় উচ্চতর নেটওয়ার্ক কাভারেজের জন্য ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ ব্যবহার করা হয়। টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেয়াল ভেদ করে ঘরের ভেতরে সিগন্যাল পৌঁছাতেও এটি কার্যকর। এর সাহায্যে অল্পসংখ্যক টাওয়ার স্থাপন করেই গ্রামাঞ্চল ও মহাসড়ক–সংলগ্ন অঞ্চলে ৫জি সেবা সম্প্রসারণে এই ব্যান্ডের চাহিদা বেশি।
বিটিআরসির তথ্য বলছে, দেশে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের মোট ৪৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ মোবাইল সেবার জন্য বরাদ্দযোগ্য। এর মধ্যে ২০ মেগাহার্টজ এখনো আইনি জটিলতায় আটকে আছে। বাকি ২৫ মেগাহার্টজ চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিলামে তোলে বিটিআরসি। প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের দাম ধরা হয় ২৩৭ কোটি টাকা। উচ্চমূল্যের কারণে এই নিলামে অংশ নেয়নি রবি ও বাংলালিংক। এতে একক দরদাতা হিসেবে গ্রামীণফোন ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ পায়। এখন নতুন করে টেলিটককে ১০ মেগাহার্টজ দেওয়ায় অন্য দুই অপারেটরের জন্য অবশিষ্ট থাকছে মাত্র ৫ মেগাহার্টজ।
টেলিটকের গ্রাহকসংখ্যা বর্তমানে ৬৮ লাখের কিছু বেশি। সে হিসাবে প্রতি লাখ গ্রাহকের জন্য তাদের হাতে আছে প্রায় শূন্য দশমিক ৮১ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম। অন্যদিকে গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে এই হার শূন্য দশমিক ১৬, রবির শূন্য দশমিক ২২ এবং বাংলালিংকের শূন্য দশমিক ২১।
‘মনোপলি’ ঝুঁকির শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক বি এম মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে অন্য অপারেটরদের জন্য পর্যাপ্ত তরঙ্গ না থাকলে বাজারে “মনোপলি” পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আর এর ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ গ্রাহক।’
মইনুল হোসেন আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেলিটককে সহায়তা করার প্রয়োজন থাকতে পারে। তবে অতীতে বরাদ্দ দেওয়া তরঙ্গ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হয়েছে এবং সেখান থেকে কী ধরনের উন্নতি এসেছে, তা মূল্যায়ন করেই নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। আগের বরাদ্দের কার্যকারিতা নিশ্চিত না করে নতুন করে তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া হলে সেটির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।’
প্রযুক্তি নীতিমালা পরামর্শক আবু নাজম মো. তানভীর হোসেনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘টেলিটকের গ্রাহকসংখ্যার তুলনায় তাদের হাতে থাকা তরঙ্গের পরিমাণ বেসরকারি অপারেটরদের তুলনায় অনেক বেশি। তাই নতুন বরাদ্দ দিতে হলে স্বচ্ছ পরিকল্পনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, নইলে দীর্ঘ মেয়াদে টেলিকম খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
তরঙ্গ বেশি, তবু সেবায় পিছিয়ে
২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করে টেলিটক। তখন বেসরকারি অপারেটরগুলোর কলরেট বেশি থাকায় টেলিটকের সিম কিনতে মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে রাষ্ট্রীয় এই অপারেটর। বিটিআরসি তথ্য বলছে, বর্তমানে টেলিটকের হাতে ৯০০, ১৮০০, ২১০০ ও ২৩০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড মিলিয়ে মোট ৫৫ দশমিক ২ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম আছে। সর্বশেষ ২০২২ সালে ২৩০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ৩০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ কিনলেও সেটি এখনো ব্যবহার শুরু করেনি অপারেটরটি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এরপরও নেটওয়ার্ক কাভারেজ, গ্রাহকসংখ্যা কিংবা রাজস্ব—কোনো ক্ষেত্রেই বেসরকারি অপারেটরদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ধারেকাছে নেই টেলিটক। দেশের মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে গ্রামীণফোন ও রবি নিয়মিত মুনাফা করে। বাংলালিংক আর্থিক হিসাব প্রকাশ করে না। তবে টেলিটক বছরের পর বছর লোকসান গুনছে। অপারেটরটির প্রকাশিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পরিচালকমণ্ডলীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর তাদের লোকসান হয়েছে ১৮০ কোটি টাকা।
টেলিটকের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. গোলাম মোরশেদ এ–সংক্রান্ত এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন স্পেকট্রামকে শুধু বাণিজ্যিক সম্পদ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটিকে রাষ্ট্রীয় টেলিকম অবকাঠামো উন্নয়নের একটি কৌশলগত ও প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নতুন স্পেকট্রামকে সরকারের “ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট” হিসেবে জাতীয় টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।’



