অ্যাপলে নতুন যুগের সূচনা: জন টারনাস প্রধান নির্বাহী, টিম কুক চেয়ারম্যান
প্রযুক্তি জগতের অন্যতম দিকপাল প্রতিষ্ঠান অ্যাপলে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী হিসেবে প্রায় ১৫ বছরের দীর্ঘ যাত্রার ইতি টানতে যাচ্ছেন টিম কুক। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের প্রধান জন টারনাস। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে টিম কুক অ্যাপলকে পুরোপুরি বিদায় জানাচ্ছেন না; তিনি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে যাবেন, যা প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি মসৃণ রূপান্তর নিশ্চিত করবে।
টিম কুকের যুগ: অ্যাপলের অভূতপূর্ব সাফল্য
৬৫ বছর বয়সী টিম কুক ২০১১ সালে অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের পর প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সময়ে অ্যাপলের ব্যবসা বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে বাজারে এসেছে নতুন ও উন্নত পণ্য। স্টিভ জবসের মতো প্রযুক্তি-কিংবদন্তি হিসেবে হয়তো তিনি সেভাবে আলোচিত হননি, তবে তাঁর নেতৃত্বেই অ্যাপল এক অভূতপূর্ব ব্যবসায়িক সাফল্যে পৌঁছেছে। ১৯৯৮ সালে অ্যাপলে যোগ দেওয়া টিম কুক কাজের চাপ কমানোর জন্য গত এক বছরের বেশি সময় ধরেই নিজের উত্তরসূরি নির্ধারণের পরিকল্পনা করছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় জন টারনাসকে এই পদে বেছে নেওয়া হলো।
কুকের সময়কালকে বলা যায় অ্যাপলের স্বর্ণযুগ। বিশেষ করে আইফোনকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে। বর্তমানে অ্যাপলের বার্ষিক মুনাফা ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে অ্যাপলের শেয়ারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। তাঁর সময়েই চালু হয়েছে অ্যাপল মিউজিক ও অ্যাপল টিভি প্লাস-এর মতো সেবা। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা তাঁর নেতৃত্বের সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
জন টারনাস: নতুন নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি
জন টারনাস জানিয়েছেন, নতুন এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পেরে তিনি গর্বিত। স্টিভ জবসের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং টিম কুকের কাছ থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনা তাঁর আগামী দিনের পথচলার বড় শক্তি বলে উল্লেখ করেন তিনি। ৫০ বছর বয়সী জন টারনাস ২০০১ সাল থেকে অ্যাপলের সঙ্গে যুক্ত। ২০১৩ সালে তিনি হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন এবং ২০২১ সালে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব নেন। অ্যাপলের বিভিন্ন পণ্যের বাহ্যিক কাঠামো ও যন্ত্রাংশ তৈরির পুরো প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে অন্যতম হলো, ম্যাক কম্পিউটারের জন্য অ্যাপলের নিজস্ব সিলিকন চিপ তৈরি করা। ২০২০ সালে ইনটেল চিপের পরিবর্তে অ্যাপলের নিজস্ব এই চিপ ব্যবহৃত হওয়ার পর ম্যাকের বিক্রি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। হার্ডওয়্যার বিভাগের নেতৃত্বে থাকাকালে তাঁর তত্ত্বাবধানেই বাজারে এসেছে অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডস, যার দুটিই এখন অ্যাপলের বড় ব্যবসায়িক খাতে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া ভিশন প্রো হেডসেট তৈরির ক্ষেত্রেও জন টারনাস সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
ক্যারিয়ারের বড় একটি সময় অ্যাপলের হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগে কাটানোর কারণে প্রতিষ্ঠানটির নাড়িনক্ষত্র টারনাসের বেশ ভালোভাবেই জানা। তাই বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, টিম কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল যে ধারাবাহিক সাফল্য ও বিপুল লাভের পথ তৈরি করেছে, টারনাসের অধীনেও তা অব্যাহত থাকবে। সহকর্মীদের কাছে টারনাস একজন সহজ-সরল ও বন্ধুসুলভ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বের ধরনও অনেকটা টিম কুকের মতোই শান্ত ও স্থির।
তবে নতুন এই পদে টারনাসের সামনে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে অ্যাপলের অবস্থান শক্ত করাটা তাঁর অন্যতম প্রধান কাজ হবে। হার্ডওয়্যারে অনেকটা এগিয়ে থাকলেও এআইয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগীদের তুলনায় অ্যাপল এখনো কিছুটা পিছিয়ে আছে। তাই অ্যাপলের ভার্চ্যুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট সিরি’কে আরও উন্নত করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবার অভাব মেটানোই এখন তাঁর জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
টারনাসের জায়গায় হার্ডওয়্যার বিভাগের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন জনি সরুজি। তিনি আগে এই বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা টারনাস পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যন্ত্রপ্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সাঁতার দলের সদস্য ছিলেন এবং বেশ কয়েকটি প্রতিযোগিতায় জয়ও পান। ১৯৯৭ সালে স্নাতক শেষের পর তিনি অল্প সময়ের জন্য একটি ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছিলেন।
এই পরিবর্তন অ্যাপলের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে, যেখানে টিম কুকের অভিজ্ঞতা এবং জন টারনাসের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানটিকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। প্রযুক্তি বিশ্বের দৃষ্টি এখন অ্যাপলের এই রূপান্তরের দিকে, যা আগামী দিনের উদ্ভাবন ও বাজার কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



