বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আখি মনি তার বাবা আলেক মোল্লাকে ‘সুপারহিরো’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘মায়ের অভাব বাবা কোনো দিন বুঝতে দেননি। আমরা বড় হয়েছি, নিজের কাজ নিজে করতে শিখেছি। এখন বাবাকে বিয়ে করতে বলি, রাজি হন না। আমাদের খুব ভালোবাসেন। বাবা হয়তো একটু আগে খেতে বসেছেন, আমি গিয়ে বাবার প্লেটেই বসে পড়ি। সবার বাবাই হিরো, কিন্তু আমার বাবা সুপারহিরো।’
সংগ্রামী পরিবার
আলেক মোল্লা রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ফুলবাড়ী গ্রামে একটি টিনের খুপরিতে পরিবার নিয়ে বাস করেন। সেখানে দুই ভাই-বোন, বাবা, দাদা-দাদি, ফুফু ও ফুফাতো ভাই মিলে সাতজনের সংসার। আলেক মোল্লাই একমাত্র রোজগেরে। তিনি দিনমজুরি করেন। সকাল থেকে বেলা একটা পর্যন্ত কাজ করলে পান ৪০০-৫০০ টাকা; বেলা তিনটা থেকে কাজ করলে পান ২৫০-৩০০ টাকা। চাহিদা অনুযায়ী মজুরি ওঠানামা করে। তিনি দুই বেলায়ই কাজ করেন।
মেয়ের শিক্ষার জন্য ঋণ
মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে গিয়ে আলেক মোল্লা ঋণ নিতে বাধ্য হন। প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ১০০ টাকা কিস্তি দেন। তবু তিনি হাসিমুখে বলেন, ‘সন্তানদের পড়াশোনার ভালো খবর ছাড়া আমার জীবনে আনন্দ বলে কিছু নাই।’
বাবা-মেয়ের সম্পর্ক
৪৫ বছর বয়সী আলেক মোল্লার বিবাহবিচ্ছেদ হয় যখন মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। তারপর আর বিয়ে করেননি। তিনি বলেন, ‘জীবনের তিন ভাগের দুই ভাগ চলে গেছে, আর এক ভাগ বাকি। এইটুকু দিয়ে ছেলে-মেয়ের একটা উন্নত জীবন গড়ে যেতে চাই। অনেকে তো অষ্টম শ্রেণির পর মেয়েকে আর পড়ালেখা করায় না, বিয়ে দিয়ে দেয়। কিন্তু আমার কখনো এমন চিন্তা মাথায় আসেনি। পড়াশোনা শেষ করে মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তখন ভালো বিয়ে দিতে পারব। মেয়েও জীবনে ভালো কিছু করতে পারবে।’
কষ্টের স্মৃতি
আলেক মোল্লা নিজে খুব বেশি পড়ালেখা করেননি; পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে গিয়েছেন। এরপর ২-৩ বছর বাড়িতে পড়েছেন, পাশাপাশি বাবার সঙ্গে কাজ করেছেন। আখি মনি চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অল্পের জন্য মেডিকেলে সুযোগ হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। তার ছোট ভাই রাব্বি রায়হান ফুলবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
সবার সহায়তা
দুই ভাই-বোনের পড়াশোনার পথ সহজ ছিল না। কেউ কেউ বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা খোঁজখবর রেখেছেন, আত্মীয়রাও সহায়তা করেছেন। এ জন্য বাবা-মেয়ে অশেষ কৃতজ্ঞ। আখি বলেন, ‘আমি চাই, বাবার জামাকাপড় ধুয়ে দেব; কিন্তু বাবা সুযোগই দেন না। নিজের কাজ নিজেই করেন। বাবার যত্নের কারণে মা ছাড়া থেকে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তা ছাড়া দাদি (মালেকা বেগম) মায়ের মতোই স্নেহ করেন।’
বাবার স্বপ্ন
আলাপের শেষে আলেক মোল্লা বলেন, ‘ওরা যখন ছোট ছিল, সারা দিন মাঠে কাজ করে এসে নিজেই ওদের পড়াতে বসেছি। খিদে পেলে ওরা যখন কিছু খেতে চেয়েছে, একটা বিস্কুটও দিতে পারি নাই, শুধু মুখে পানি দিয়ে রেখেছি। তখন খুব কষ্ট হতো। এই কষ্ট ভুলতে পারি না।’ বাবাসহ পুরো পরিবারকে একটি সচ্ছল জীবন উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এখন পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন আখি মনি।



