মার্কিন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও স্বয়ংক্রিয় মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কৌশল থেকে সরে আসছে। প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় গত তিন বছরে ৩৫০ জনের বেশি অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে আবারও প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে এনেছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। পণ্যের মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি কমেছে ব্যয়ও।
পুনর্নিয়োগের কারণ ও প্রক্রিয়া
বার্তা সংস্থা ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুনর্নিয়োগ পাওয়া প্রকৌশলীদের মধ্যে রয়েছেন ফোর্ডের সাবেক কর্মী ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা। কয়েক বছর ধরে এআই–নির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন ও উৎপাদনের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার চেষ্টা করছিল ফোর্ড। তবে বাস্তবে সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
ফোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল যে বহু প্রজন্মের গাড়ি উন্নয়নে কাজ করা প্রকৌশলীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও অর্জিত জ্ঞানকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। ফোর্ডের ভেহিকেল হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস পুন স্বীকার করেছেন, এআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত আশাবাদী ছিল। ফোর্ড মনে করেছিল, নকশাসংক্রান্ত বিপুল তথ্য এআইকে সরবরাহ করলেই সেটি উচ্চ মানের পণ্য তৈরিতে সক্ষম হবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের ভূমিকা
চার্লস পুন বলেন, 'এআই নিঃসন্দেহে শক্তিশালী একটি প্রযুক্তি, তবে এটি কেবল সেই তথ্যের মানের ওপরই নির্ভর করে, যেসব তথ্য দিয়ে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।' তাঁর মতে, বহু অভিজ্ঞ প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান ছাড়ার আগে তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সংরক্ষণের পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বাস্তব অভিজ্ঞতার ঘাটতিতে এআইভিত্তিক ব্যবস্থাগুলো উন্নয়ন পর্বেই সম্ভাব্য ত্রুটি শনাক্ত করতে পারেনি। এই ঘাটতি কাটিয়ে উঠতেই ৩৫০ জনের বেশি অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে আবারও নিয়োগ দিয়েছে ফোর্ড। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তাঁরা 'গ্রে বিয়ার্ড' প্রকৌশলী নামে পরিচিত। বর্তমানে তাঁরা তরুণ প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, এআই টুলকে আরও কার্যকর করে তুলতে সহায়তা করছেন এবং উৎপাদন পর্বে যাওয়ার আগেই সম্ভাব্য ত্রুটি শনাক্ত করছেন।
ফোর্ডের ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল
ফোর্ডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কুমার গালহোত্রা বলেন, 'কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছিল।' তাঁর মতে, ফোর্ডের ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছেন এই অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা। তাঁরা বাধ্যতামূলক মান পর্যালোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং সমস্যা দেখা দেওয়ার পর সমাধানের পরিবর্তে শুরুতেই তা প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলছেন।
গালহোত্রা বলেন, 'আমরা এখন ত্রুটি শনাক্ত করে পরে সমাধান করার পদ্ধতি থেকে সরে এসে শুরুতেই সমস্যা প্রতিরোধে গুরুত্ব দিচ্ছি। সমস্যাকে শুধু চিহ্নিত করলেই হবে না, তার সমাধানও নিশ্চিত করতে হবে।' তবে এর অর্থ এই নয় যে ফোর্ড এআই প্রযুক্তি থেকে সরে আসছে; বরং অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিটিকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করছে।
এআই ব্যবহার ও সাফল্য
ফোর্ড জানিয়েছে, তারা এক লাখের বেশি এআই–নির্ভর ভেরিফিকেশন পরীক্ষা চালু করেছে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতি শনাক্ত করা ও নানা পরিবেশে গাড়ির সফটওয়্যারের কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই স্বয়ংক্রিয় পরীক্ষাব্যবস্থা সফটওয়্যারে শেষ মুহূর্তের কোনো পরিবর্তন এলেও দ্রুত পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ দেয়। ফলে গ্রাহকের হাতে গাড়ি পৌঁছানোর আগেই সম্ভাব্য ত্রুটি শনাক্ত ও সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের পুনর্নিয়োগের সুফলও পেতে শুরু করেছে ফোর্ড। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ জেডি পাওয়ার ইনিশিয়াল কোয়ালিটি জরিপে মূলধারার ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে তারা। একই সঙ্গে উৎপাদনসংক্রান্ত ব্যয়ও কমেছে।



