মহাকাশ মানেই রহস্য। আর তাই বিশাল মহাকাশের গভীর থেকে আসা রহস্যময় নীল আলোর উৎস জানতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, মহাকাশের গভীর থেকে আসা রহস্যময় নীল আলো ২০১৮ সালে প্রথম টেলিস্কোপে ধরা পড়ে। তবে এই আলো মহাজাগতিক কোনো পরিচিত ঘটনার সঙ্গে মিলছে না। এ পর্যন্ত ১৪ বার একই ধরনের তীব্র আলোর স্পন্দন বা পালস শনাক্ত করা গেলেও সেগুলোর উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায়, আলোর এই ঝলকানিকে বলা হয় লুমিনাস ফাস্ট ব্লু অপটিক্যাল ট্রানজিয়েন্ট বা এলএফবিওটি। এমন আলো মহাবিশ্বের যেকোনো চেনা বিস্ফোরণের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত জ্বলে ওঠে। এগুলো সাধারণ নক্ষত্রের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি উজ্জ্বল হতে পারে। অত্যন্ত বিরল এই আলোর ঝলকানি মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম এক রহস্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
নীল আলোর সম্ভাব্য উৎস
বর্তমানে একদল বিজ্ঞানী এই রহস্যের জট খোলার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন। তাঁদের মতে, একটি কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোলের সঙ্গে একটি উত্তপ্ত নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে এই অদ্ভুত আলোর উৎপত্তি হতে পারে। এ বিষয়ে হার্ভার্ড ও স্মিথসোনিয়ানের গবেষক অ্যানিয়া নুজেন্ট বলেন, ‘এটি আমাদের আগে পর্যবেক্ষণ করা যেকোনো তথ্যের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এলএফবিওটির উৎপত্তি যেমন হিংস্র এবং অস্বাভাবিক, তেমনই এর পেছনের মহাজাগতিক ঘটনাটিও অত্যন্ত বিরল।’
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা নীল আলো যে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ থেকে এসেছে, তা নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা করছেন। তাঁরা ওই গ্যালাক্সির নক্ষত্র গঠনের হার, ভর ও ধাতব উপাদানের মাত্রা পরিমাপ করেছেন। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই এলএফবিওটির একটি সম্ভাব্য মানচিত্র তৈরি করেছেন তাঁরা।
ওলফ-রায়েট নক্ষত্রের ভূমিকা
এ বিষয়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ব্রায়ান মেটজার জানিয়েছেন, যখন কোনো ঘন বস্তু ওলফ-রায়েট নক্ষত্রের ভেতরে নিমজ্জিত হয়, তখন এটি অত্যন্ত দ্রুত নক্ষত্রের উপাদানগুলো গিলে ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে মহাকর্ষীয় শক্তি নির্গত হয়। সেই শক্তির কিছু অংশ শক্তিশালী বহিঃপ্রবাহ বা জেট তৈরি করে, যা নক্ষত্রের চারপাশে থাকা উপাদানের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়। এই পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াই খুব অল্প সময়ের জন্য একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত ও উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি তৈরি করতে পারে।
ওলফ-রায়েট নক্ষত্র এলএফবিওটি তৈরির জন্য কয়েকটি কারণে বেশ উপযুক্ত। প্রথমত, এলএফবিওটি থেকে আসা আলোতে হাইড্রোজেনের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। এটি প্রমাণ করে এই আলো এমন নক্ষত্র থেকে আসছে, যা আগেই তার হাইড্রোজেনের স্তর হারিয়েছে। ওলফ-রায়েট নক্ষত্রগুলো ঠিক এমনই হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, এই নক্ষত্র অত্যন্ত বিশাল ও ঘন হয়। এর ফলে ভেতরের ব্ল্যাক হোলটি যত দ্রুত সম্ভব শক্তি গ্রাস করতে পারে। এটি একটি বিশাল আলোর বিস্ফোরণ ঘটায়।
রহস্যের সমাধান
বিজ্ঞানীদের মতে, ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষের তত্ত্ব নীল আলোর পেছনের সবচেয়ে বড় রহস্য সমাধান করতে সাহায্য করে। এলএফবিওটি আলোগুলোকে সাধারণত গ্যালাক্সির একদম বাইরের প্রান্তে দেখা যায়, যা গ্যালাক্সির মূল কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে। ২০২৩ সালে নাসা দ্য ফিঞ্চ নামের একটি নীল আলোর খোঁজ পায়। এটি তার নিকটবর্তী সর্পিল গ্যালাক্সি থেকে প্রায় ৫০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে সম্পূর্ণ একা জ্বলছিল। আরেকটি আলো গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে ৫৫ হাজার আলোকবর্ষ দূরে দেখা যায়। নক্ষত্রের বিস্ফোরণের কারণে যদি এই আলো তৈরি হতো, তবে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যেখানে নক্ষত্ররা ঠাসাঠাসি করে থাকে, সেখানে এটি বেশি দেখা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এটি ঘটছে একদম জনমানবহীন প্রান্তে।
সূত্র: ডেইলি মেইল



