এআই ক্যামেরার ভয়ে ঢাকায় শৃঙ্খলা ফিরছে চালকদের মাঝে
এআই ক্যামেরার ভয়ে ঢাকায় শৃঙ্খলা ফিরছে চালকদের মাঝে

এলিফ্যান্ট রোড থেকে শাহবাগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন রাইড শেয়ার চালক ফরিদ। রাজধানীর সকালটা তখন ব্যাপক কর্মব্যস্ত। পেছনে যাত্রী, সামনে যানজট আর মাঝখানে একের পর এক ট্রাফিক সিগন্যাল। পেছনে বসা যাত্রীর গন্তব্য পল্টন, দ্রুত পৌঁছানোর চাপ আছে। কিন্তু তাড়াহুড়োর মাঝেও ফরিদের মাথায় ঘুরছে আরেকটি চিন্তা, কোথাও যেন সিগন্যাল ভাঙা না হয়। কারণ, রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তায় এখন দাঁড়িয়ে থাকে নতুন এক নীরব প্রহরী। তার হাতে বাঁশি নেই, নেই লাঠিও। তবু তাকে এড়িয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না অনেক চালক। মোড়ের ওপরে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকা সেই প্রহরীর নাম—‘এআই ক্যামেরা’।

কাঁটাবন থেকে শাহবাগ: সতর্ক ফরিদ

কাঁটাবন মোড় পার হতেই ফরিদ আরও সতর্ক হয়ে গেলেন। সামনে শাহবাগ সিগন্যাল। কিছুক্ষণ পর মোড়ে পৌঁছে বাইক থামালেন স্টপ লাইনের আগেই। অবশ্য আশপাশ দিয়ে অনেক যানবাহনই চলে যাচ্ছে, কেউ কেউ সিগন্যালের তোয়াক্কাও করছে না। কিন্তু ফরিদ নড়লেন না। পেছন থেকে যাত্রী জানতে চাইলেন, ‘দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’ ফরিদ উত্তর দিলেন না। তার চোখ তখন ট্রাফিক কনস্টেবলের হাতের ইশারায়। কারণ ট্রাফিক লাইটটি কাজ করছিল না। কিছুক্ষণ পর কনস্টেবল চলার সংকেত দিলে তবেই বাইক এগোল। কারণ, এখন ট্রাফিক আইনের সাক্ষী শুধু পুলিশ সদস্যরাই নন, ক্যামেরাও। আর সেই ক্যামেরা ভুলে যায় না কিছুই।

এআই ক্যামেরার নজরদারি

ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক ক্যামেরা। এআই-প্রযুক্তিসম্পন্ন এসব ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে ‘লাল বাতি অমান্য’, ‘স্টপ লাইন ভঙ্গ’, ‘উল্টো পথে চলাচল’, ‘জেব্রা ক্রসিং দখল’, ‘হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো’, ‘সিটবেল্ট না পরা’, ‘অবৈধ পার্কিং’ কিংবা ‘অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের’ মতো আইনভঙ্গের ঘটনা। ট্রাফিক বিভাগের তথ্যমতে, রাজধানীর গুলশান, উত্তরা, বিমানবন্দর সড়ক, রামপুরা, মহাখালী, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, হাইকোর্ট ক্রসিং, সচিবালয়, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন, কাকরাইল, বাংলামোটর, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, গাবতলীসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ মোড় এখন এআই নজরদারির আওতায়। শাহবাগ মোড়ে এখনো এই কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হয়নি, তবু চালকদের মনে ভয় তৈরি হয়েছে আগেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জানতে চাইলে ফরিদ বলেন, ‘জায়গায় জায়গায় ক্যামেরা। কোথায় আছে, আর কোথায় নাই; সেটা মাথায় রাখা আসলে খুব কঠিন। এর চেয়ে লাল বাতি দেখে দাঁড়িয়ে থাকা ভালো। ধরেন, শাহবাগে হয়তো কাজ করছে না, কিন্তু সামনে মৎস্য ভবনে আছে। এখানে যদি সিগন্যাল না মেনে যাই, সামনেও ভাঙতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু ওইখানে ভাঙলে তো মামলা নিশ্চিত। রাইড শেয়ার করে যদি মামলাতেই সব টাকা চলে যায় তাতে তো মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে।’

মৎস্য ভবনে দৃশ্য

শাহবাগ পেরিয়ে মৎস্য ভবনের দিকে যেতে দেখা গেল লম্বা যানবাহনের সারি। ফাঁক গলে এক মোটরসাইকেল আরোহী সামনে এগিয়ে গেলেও জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করলেন না। পাশ থেকে বাসের হেল্পার মজা করে বললেন, ‘সামনে যান না কেন?’ বাইক চালক হাত নেড়ে ‘না’ সূচক ইশারা করলেন। তারপর দেখালেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক কনস্টেবল, পাশে সার্জেন্ট আর ওপরে ঝুলে থাকা ক্যামেরা। এরপর সিগন্যাল ছাড়ার অপেক্ষায় বসে থাকলেন তিনি।

প্রযুক্তির দায়িত্ব ও চালকদের আচরণে পরিবর্তন

ট্রাফিক সিগন্যালে এআই ক্যামেরা বসানোর পর থেকে ট্রাফিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একসময় রাজধানীর সড়কে গাড়ি থামাতে হিমশিম খেতে হতো তাদের। এখন প্রযুক্তিই অনেকটা সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। আইনভঙ্গ শনাক্ত হচ্ছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে, কমছে প্রভাব খাটিয়ে পার পাওয়ার সুযোগও। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হয়তো মানুষের আচরণেই। যে শহরে সিগন্যাল মানা ছিল অনেকটা ব্যতিক্রম, সেই শহরেই এখন লাল বাতি জ্বললে দাঁড়িয়ে থাকে কিছু মোটরসাইকেল। আশপাশের সব যান এগিয়ে গেলেও দাঁড়িয়ে থাকে তারা। কারণ ওপরে তাকিয়ে থাকে ক্যামেরা। আর ভেতরে কাজ করে মামলার ভয়। সবাই চলে গেলেও তাই দাঁড়িয়ে থাকে ফরিদের বাইকটি।