ভাইরাল ‘রাগ করলা?’ সংলাপের পিছনে আসল সত্য
ভাইরাল ‘রাগ করলা?’ সংলাপের পিছনে আসল সত্য

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত ও ভাইরাল সংলাপগুলোর একটি হলো—‘রাগ করলা?’ কথাটি ঠিক না বেঠিক?’। ফেসবুকের পোস্টের ক্যাপশন, মন্তব্যের ঘর, ইনবক্সের চ্যাট—সব জায়গাতেই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে এই সংলাপ। কেউ হাস্যরসের জন্য, কেউ ব্যঙ্গ করতে, আবার কেউ খোঁচা দেওয়ার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন এটি।

ভাইরাল সংলাপের উৎস

ভাইরাল এই সংলাপের উৎস অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘Iman Alli’ নামের একটি ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ১২ মে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ৩ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘দানবের মতো ছেলেটির হাত দেখে কবিরাজ ভবিষ্যৎ বলে দিল...’ ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে থাকা এক ব্যক্তি একজন যুবকের হাত দেখে ভবিষ্যৎ গণনা করছেন। ভবিষ্যৎ বলার সময় তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে প্রতিটি কথার শেষে বলছিলেন—‘রাগ করলা?’ আর সেখান থেকেই মূলত ভাইরাল হয়ে যায় এই সংলাপ।

আজ মঙ্গলবার বিকালে এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বার দেখা হয়েছে। ভিডিওটিতে প্রতিক্রিয়া পড়েছে ৪ লাখ ৭০ হাজারের বেশি, মন্তব্য এসেছে প্রায় ২৬ হাজার এবং শেয়ার হয়েছে সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভিডিওটি কি বাস্তব?

ভিডিওটি দেখে অনেকেই সেটিকে বাস্তব ঘটনা বলে ধরে নিয়েছেন। সানা উল্লাহ মাহমুদ কায়সার নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘এগুলি যাকে বলবে সবার সাথেই মিলবে! এরা বস্তুত ধুরন্ধর চালাক!’ কৃষ্ণ সরকার নামের আরেকজন লেখেন, ‘মানুষের জীবনের কমন সমস্যা। কবিরাজ ভালোই পয়েন্টগুলো মুখস্থ করছে।’

মূলত ভিডিওতে ওই ব্যক্তির কথা বলার ধরন, চোখের ইশারা, নাটকীয় ভঙ্গি এবং ‘রাগ করলা?’ সংলাপের পুনরাবৃত্তিই দর্শকদের কাছে হাস্যরসের বিষয় হয়ে ওঠে। সেখান থেকেই সংলাপটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকজুড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইমান আলী কে?

ভাইরাল হওয়ার পর অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন ওঠে—ভিডিওতে দেখা ব্যক্তি কি সত্যিই কোনো কবিরাজ? এ বিষয়ে অনুসন্ধানে ভিডিও পোস্ট করা ‘Iman Alli’ প্রোফাইলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার সহকারী হানিফ প্রথম আলোকে জানান, ইমান আলী কোনো কবিরাজ নন; তিনি দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত। হানিফ বলেন, ‘অনেকেই এখন সত্যি সত্যি ইমান আলিকে কবিরাজ মনে করছেন। কিন্তু ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি সম্পূর্ণ অভিনয় ছিল। এটি শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।’

ভিডিও পোস্ট করা প্রোফাইলটিও পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সেখানে ইমান আলী নিজেকে ‘ডিজিটাল ক্রিয়েটর’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং নিয়মিত অভিনয়ভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ করেন। একই ধরনের আরও অনেক হাস্যরসাত্মক ভিডিও ওই প্রোফাইলে পাওয়া গেছে।

অভিনয় দলের তথ্য

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, ইমান আলীর অভিনীত কনটেন্ট অন্তত ১৩টির বেশি ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলে নিয়মিত প্রচার করা হয়। এসবের একটি ‘HM Comedy BD’ পেজে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে মুন্নি আক্তার নামের অভিনয় দলের এক সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুটিংয়ের সময় অনেক সময় মনমতো অভিনয় না হলে আমরা একে অপরকে মজা করে বলতাম—কি রাগ করলা? সেখান থেকেই এই সংলাপ ভাইরাল হয়ে যায়।’

অন্যদিকে, ১৩টি পেজের সমন্বয়কারী পরিচয় দেওয়া হারুন অর রশিদ প্রথম আলোকে জানান, তাদের একাধিক বিনোদনভিত্তিক ফেসবুক পেজ রয়েছে। হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমরাই টিমের সদস্যদের দিয়ে বিভিন্ন পেজ ও প্রোফাইল খুলেছি। আমাদের তৈরি করা অভিনয়ভিত্তিক কনটেন্টগুলো সেখানে পোস্ট করা হয় এবং সেগুলো মনিটাইজড।’

ইমান আলীর সাক্ষাৎকার

ভাইরাল ভিডিওটি নিয়ে পরে ফেসবুকে ‘শামীম হোসেন’ নামের একটি আইডি থেকে ইমান আলীর একটি সাক্ষাৎকারও প্রচার করা হয়। সেখানে ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘কবিরাজের আসল ঘটনা ফাঁস— “রাগ করলা” খ্যাত ইমান আলীর এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ।’ সাক্ষাৎকারে ইমান আলী বলেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির শুটিং হয়েছিল গাজীপুরের চন্দ্রায়। শুটিংয়ের সময় একটি চায়ের দোকানে কাজ করা এক তরুণের হাত দেখে তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন কথা বলতে শুরু করেন তিনি। ঘটনাচক্রে তার বলা কিছু কথা ওই তরুণের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। তখন ওই তরুণ অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কীভাবে এগুলো বললা? তুমি তো কবিরাজ না!’

ইমান আলী জানান, বাস্তবে তিনি কোনো কবিরাজ নন। তবে এ ধরনের অভিজ্ঞতা তার নিজের জীবনে ঘটেছিল বলেই সেই অভিজ্ঞতা থেকে ভিডিওটির ধারণা পান। ইমান আলী বলেন, একসময় তিনি গুলিস্তানে রিকশা চালাতেন। একদিন সেখানে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি বিভিন্ন গাছপালা ও তাবিজজাতীয় জিনিস বিক্রি করছিলেন। কৌতূহলবশত তিনি লোকটির পাশে দাঁড়ালে ওই ব্যক্তি প্রথমে তার কাছে ১০ টাকা চান। পরে ধাপে ধাপে ৫০ টাকা এবং শেষ পর্যন্ত তার কাছে থাকা ২০০ টাকাও নিয়ে নেন।

ইমান আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তার কাছে মোট ২৩০ টাকা ছিল এবং সেই পুরো টাকাই তিনি হারান। পরে তিনি বুঝতে পারেন, প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ওই ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করে কোনো উপকার তো হয়নি বরং ক্ষতিই হয়েছে। ইমান আলী বলেন, ‘সেই অভিজ্ঞতাটা আমার মাথায় থেকে যায়। এর পর থেকেই ভাবছিলাম, মানুষকে কীভাবে এসব ভণ্ড কবিরাজ প্রতারণা করে, সেটা নিয়ে একটা শিক্ষামূলক কনটেন্ট বানাবো।’

ইমান আলীর দাবি, সমাজে এমন কিছু প্রতারক ও ভণ্ড কবিরাজ রয়েছে, যারা সাধারণ ও সরল মানুষকে নানা কথায় প্রভাবিত করে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেয়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি মূলত সেই প্রতারণার চিত্রকে হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরতেই তৈরি করা হয়েছিল।