কোয়ান্টাম জগৎ নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত। আসুন জেনে নিই সাতটি সাধারণ ভুল ধারণা ও তার সঠিক ব্যাখ্যা।
সবকিছুই কি দৈব? কোয়ান্টাম জগৎ মানেই সব এলোমেলো নয়
অনেকের ধারণা, কোয়ান্টাম জগৎ সম্পূর্ণ এলোমেলো। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি শুনলে এমনটা মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু পুরোটা ঠিক নয়। পরমাণুর জগতের অনেক কিছুই আমরা দারুণ নিখুঁতভাবে মাপতে পারি এবং ভবিষ্যদ্বাণীও করতে পারি। হ্যাঁ, এখানে সম্ভাবনার বড় খেলা আছে, কিন্তু তাই বলে পুরো জগৎটা কোনো নিয়ম ছাড়া চলছে না।
কোয়ান্টাম মেকানিকস কি কল্পনা করা যায়?
বিখ্যাত পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান একবার বলেছিলেন, 'কেউই কোয়ান্টাম মেকানিকস বোঝে না।' কোয়ান্টাম জগৎ সত্যিই জটিল গণিতে ভরা, তাই অনেকেই ভাবেন একে কল্পনা করা বা এর ছবি আঁকা অসম্ভব। কিন্তু বিজ্ঞানীরা ঠিকই এর ছবি এঁকেছেন, যেমন ওয়েভ ফাংশন বা ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম। এগুলোর সাহায্যে অতিপারমাণবিক কণাগুলোর আচরণ কাগজে এঁকে ফেলা যায়।
কোয়ান্টাম মেকানিকস কি জাদুবিদ্যা সমর্থন করে?
কোয়ান্টাম জগতের অদ্ভুত নিয়ম শুনে অনেকেই একে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। আসলে এটা পুরোপুরি ভুল। বিজ্ঞানীদের কাছে কোয়ান্টাম মেকানিকস অন্যতম সফল ও পরীক্ষিত শাখা। আমাদের হাতের স্মার্টফোনের মাইক্রোপ্রসেসর, লেজার—এসবই কোয়ান্টাম মেকানিকসের দান। তাই একে জাদুর বদলে আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি বলাই ভালো। আইনস্টাইন নিজেই ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম ধারণা ব্যবহার করে ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং ১৯২২ সালে নোবেল পেয়েছিলেন।
মহাবিশ্বের সব প্রশ্নের উত্তর কি কোয়ান্টামে আছে?
অনেকে ভাবেন কোয়ান্টাম ফিজিকস বুঝি এক নতুন ধর্ম, মহাবিশ্বের শুরু ও প্রাণের উত্তর এখানে মিলবে। সত্যি বলতে, এসব বড় প্রশ্নের উত্তর কোয়ান্টাম মেকানিকসে নেই। কোয়ান্টাম মানে অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ। এটি শুধু পরমাণু ও মৌলিক কণার জগতের নিয়ম নিয়ে কাজ করে। এর বাইরেও অনেক জগৎ আছে।
একটি কণা কি একই সঙ্গে দুই জায়গায় থাকতে পারে?
ওয়েভ ফাংশন বলে কোনো কণা কোথায় থাকার সম্ভাবনা কতটা। অঙ্কের হিসাবে কণার তরঙ্গ অনেক জায়গায় ছড়িয়ে থাকতে পারে। তার মানে কি কণাটি বাস্তবে একই সময়ে সব জায়গায় আছে? না। ওয়েভ ফাংশন শুধু গাণিতিক সম্ভাবনা। কণাটি বাস্তবে যেকোনো এক জায়গাতেই থাকে। আমরা মাপার আগ পর্যন্ত জানি না সেটা কোথায় আছে। মাপার সময় ওয়েভ ফাংশন ধসে পড়ে এবং কণাটি নির্দিষ্ট জায়গায় ধরা দেয়।
আইনস্টাইন কি কোয়ান্টামের শত্রু ছিলেন?
মোটেই না। আইনস্টাইন নিজেই কোয়ান্টাম ব্যবহার করে ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং নোবেল পেয়েছিলেন। তাহলে শত্রু কেন ভাবা হয়? কারণ তিনি বলেছিলেন, 'ঈশ্বর পাশা খেলেন না।' তিনি কোয়ান্টামের সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তা মেনে নিতে পারছিলেন না। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানে সবকিছু নির্দিষ্ট, কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে অনিশ্চয়তাই রাজা। কেবল এই জায়গাটিতেই তাঁর আপত্তি ছিল।
কণাগুলো কি ইচ্ছেমতো তরঙ্গ ও কণায় রূপ বদলায়?
আমাদের চারপাশের জগৎ আমরা যেভাবে দেখি, পরমাণুর জগৎ তার চেয়ে আলাদা। আমরা বল বলতে কণা বুঝি, আর পানিতে ঢিল ছুড়লে তরঙ্গ বুঝি। অতিপারমাণবিক জগৎ এতই অদ্ভুত যে আমরা এই বল ও তরঙ্গের ছবি দিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করি। ফাইনম্যান বলেছিলেন, 'ইলেকট্রন তরঙ্গের মতো আচরণ করে... না, ঠিক তা নয়। ইলেকট্রন কণার মতো আচরণ করে... না, এটাও ঠিক নয়।' আসলে ইলেকট্রন বা প্রোটন পুরোপুরি কণাও নয়, তরঙ্গও নয়। তারা ইচ্ছেমতো রূপ বদলায় না। আমরা বোঝার সুবিধার জন্য কখনো কণা, কখনো তরঙ্গ মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করি মাত্র।
তাই বুঝলেন? কোয়ান্টাম জগৎ অদ্ভুত ঠিকই, কিন্তু জাদুকরী কিছু নয়। এটি প্রকৃতিরই এক দারুণ সুন্দর নিয়ম, যাকে আমরা বিজ্ঞান দিয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে বুঝছি।



