সঞ্চয়পত্র কিনতে ব্যাংকে ভোগান্তি: এপিআই সংযোগে সমাধানের পথ দেখালেন বিশেষজ্ঞ
সঞ্চয়পত্র কিনতে ব্যাংকে ভোগান্তি, এপিআই সংযোগে মিলবে সমাধান

কয়েক দিন ধরে সঞ্চয়পত্র কিনতে বিভিন্ন ব্যাংকে ঘুরতে গিয়ে লেখক রকিবুল হাসান যা দেখেছেন, তা কষ্টকর। একটি সরকারি ইনস্ট্রুমেন্ট কিনতে গ্রাহককে যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, ওপরের মহলের লোকজন সেটা সম্ভবত জানেন না। কাউন্টারে লাইন, সার্ভার ডাউন, এনআইডির সঙ্গে ফোন নম্বর মিলছে না, আবার ফরম পূরণ ও এন্ট্রি। মাসের শেষ দিকে অনেক ব্যাংক ২০ তারিখের পর সঞ্চয়পত্র নেওয়াই বন্ধ করে দেয়, চাপ সামলাতে পারে না। সেই টাকা তখন অন্য খাতে চলে যায়।

সমস্যা সফটওয়্যার ও সার্ভারে

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সিস্টেমে প্রায়ই সার্ভার সমস্যা হয়। প্রতিটি ব্যাংক বা ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন সেখানে আলাদাভাবে ম্যানুয়াল এন্ট্রি দেয়। অথচ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে এটা পিছিয়ে দিচ্ছে। লেখকের মতে, সমাধান সহজ।

এপিআই সংযোগে সম্ভাবনা

সঞ্চয় অধিদপ্তরের সিস্টেম যদি এপিআই এক্সপোজ করত, তাহলে যেকোনো ব্যাংক তাদের নিজের মোবাইল অ্যাপ থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে পারত। আলাদা করে কাউন্টারে যেতে হতো না, আলাদা সার্ভারে লগইন করতে হতো না। গত কয়েক বছরে ব্যাংকে না গিয়েই মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ৮০ শতাংশ কাজ করা সম্ভব হয়েছে, মোবাইল ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে অভূতপূর্ব কাজ হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একজন গ্রাহক এখন যেভাবে ব্যাংক অ্যাপ থেকে ডিপিএস খোলেন, ঠিক সেভাবে সঞ্চয়পত্র কিনতে পারতেন—বাসায় বসে, রাত ১২টায়, কয়েক মিনিটের মধ্যেই। এই এপিআই সংযোগ হলে আরও বড় কাজ হয়।

একীভূত ডেটাবেজের প্রয়োগ

গ্রাহক যখন ব্যাংক অ্যাপ থেকে সঞ্চয়পত্র কিনতে যাবেন, সিস্টেম প্রথমে চেক করবে তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কেওয়াইসিতে এনআইডি আছে কি না। এনআইডি থাকলে সেই এনআইডির সঙ্গে লিংকড মোবাইল নম্বর চেক হবে। মোবাইল নম্বর না থাকলে মোবাইল অপারেটরের অ্যাপ থেকে আপডেটের অপশন আসবে। এরপর এনবিআরের ডেটাবেজ থেকে টিআইএন ভেরিফাই হবে ও সঞ্চয়পত্র কেনার লিমিট চেক হবে। পুরো চেইনটা এক ফ্লোতে শেষ হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশে এই ডেটাগুলো আছে—এনআইডি, মোবাইল আইএমইআই, টিআইএন। গত সরকারগুলোর ধাক্কাধাক্কিতে অনেক জায়গায় সংযোগ পেয়েছে, কিন্তু বেশির ভাগ জায়গায় এখনো আলাদা দ্বীপের মতো বসে আছে।

ভারতের ইউপিআই মডেল

ভারতে ইউপিআই আসার আগে পেমেন্ট মানেই ছিল ব্যাংকের বিশাল লাইন। ২০১৬ সালে ইউপিআই আসার পর এখন সরকারি বন্ড মোবাইল অ্যাপ থেকে কেনা যায়, সেকেন্ডে ট্রানজেকশন হয়। মূল কারিগরি হলো সরকারি সার্ভিসগুলোর মধ্যে এপিআই কানেকশন। আলাদা সিস্টেম না রেখে কমন ফ্রেমওয়ার্কে আনা।

বাংলাদেশে প্রাইভেট ব্যাংক, বিকাশ, নগদ, রকেট—এরা এপিআই ভালোই বোঝে। তারা প্রতিদিন কোটি কোটি ট্রানজেকশন হ্যান্ডল করছে। টেকনিক্যাল ক্যাপাবিলিটি আছে। শুধু দরকার সরকারের পক্ষ থেকে সিস্টেম ওপেন করে দেওয়া।

সরকারের লাভ কী?

মাসের শেষে ব্যাংক সঞ্চয়পত্র নেওয়া বন্ধ করলে সেই টাকা এফডিআরে, শেয়ারে বা ট্রাংক ও আলমারিতে যায়—সরকারের কাছে যায় না। সরকারের বাজেটঘাটতি পূরণে সঞ্চয়পত্র গুরুত্বপূর্ণ। এপিআই এক্সপোজার হলে ক্যাশলেস ট্রানজেকশন বাড়বে। এখনো টাকা ছাপাতে হাজার কোটি টাকা খরচ হয়।

এপিআই সংযোগে ২৪ ঘণ্টা সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ফিন্যান্সিয়াল ইনস্ট্রুমেন্ট বিক্রি হবে। জুনের ৩০ তারিখ রাত ১১টায়ও কেনা যাবে। সার্ভারে চাপ কমবে, লোড ছড়িয়ে যাবে সব ব্যাংকের সিস্টেমে। সরকারের রাজস্ব বাড়বে, গ্রাহকের ভোগান্তি কমবে, ব্যাংকের ম্যানপাওয়ার বাঁচবে।

প্রযুক্তি এখানে নতুন কিছু আনছে না। শুধু এনআইডি, মোবাইল নম্বর, টিআইএন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট—এই চারটা জিনিস একটা সুতায় গাঁথা হলে কাজ শেষ। সুতাটার নাম এপিআই।

নিরাপত্তা ও বাস্তবায়ন

নিরাপত্তার প্রশ্নে লেখক মনে করেন, সরকার নীতিমালা ও নীতিমালা-সমর্থিত সিস্টেম তৈরিতে ভালো; প্রাইভেট সেক্টর বাকি সবকিছুতে ভালো। ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলোর অ্যাসোসিয়েশন অথবা দক্ষ কোম্পানিকে ‘কারিগরি দক্ষতা’র ভিত্তিতে লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। তাদের কাজ হবে সরকারের পক্ষ হয়ে নিরাপত্তা বজায় রেখে বিভিন্ন ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে সংযোগ প্রদান করা।

ফলে তৈরি হবে ক্যাশলেস সোসাইটি। সেকেন্ডে বিলিয়ন ট্রানজেকশন সাহায্য করবে মানুষের মধ্যে টাকা ঘুরতে। এতেই ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।