কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বোমা তৈরি করে দেশব্যাপী হামলার পরিকল্পনা
মাদ্রাসায় বোমা: দেশব্যাপী হামলার পরিকল্পনা জঙ্গিদের

ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের একটি মাদ্রাসায় তৈরি করা বোমা দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার পরিকল্পনা ছিল জঙ্গিদের। একইসঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হুমকি দেওয়ারও চেষ্টা করছিল নিষিদ্ধ একটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গত প্রায় চার মাসেও ঘটনার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

১৭ জন গ্রেফতার, পরিকল্পনা ছিল ভয়াবহ

মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত মোট ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা বিস্ফোরক ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে হামলার পরিকল্পনা ছিল তাদের। পাশাপাশি এসব বিস্ফোরণের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যও ছিল।

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা সংগঠিত হয়ে নাশকতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয় এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে সাধারণ ধর্মভীরু মানুষকে সংগঠনে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালায়। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তৈরি করে উগ্র ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সদস্য সংগ্রহ ও জিহাদি কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জেএমজেবির সমর্থকরা জড়িত

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃতরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশের (জেএমজেবি) সমর্থক। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহ, সমর্থন ও প্ররোচনা দিয়ে আসছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মাদ্রাসার আড়ালে সেখানে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালিত হতো। আস্তানা গড়ে বোমা তৈরি করা হচ্ছিল, যার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা ছিল। তবে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাতেই তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

ঘটনার বিবরণ

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর কেরাণীগঞ্জের হাসনাবাদের উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ভবনের দুটি কক্ষের দেওয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পাশের একটি সিএনজি গ্যারেজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়রা জানান, তিন থেকে চার দিন পর একই স্থানে আবারও একটি বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে একজন আহত হন।

ঘটনার পর বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্ত জঙ্গি নেতা ও বোমা তৈরির কারিগর আল আমিন শেখসহ মোট ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা এন্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)। তাদের মধ্যে সাতজন এজাহারভুক্ত আসামি।

তদন্তে অগ্রগতি

তদন্ত সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃতদের কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এসময় গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা যাচাই-বাছাই চলছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সুত্র আরও জানায়, শেখ আল আমিনসহ গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কয়েকজন এর আগেও অন্তত পাঁচ থেকে সাতবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তবে জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কাজ শুরু করেন।

জানা গেছে, শেখ আল আমিনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ ৭টি মামলার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মামলাগুলো বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে— ২০২৫ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া নারায়ণগঞ্জে ফতুল্লা থানার মামলা, ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানায় একই আইনে দায়ের হওয়া দুটি মামলা, ঢাকার মতিঝিল থানায় ২০২০ সালে দায়ের হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা, ২০১৭ সালে নরসিংদী মডেল থানায় দায়ের হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা, বাগেরহাটের মোল্লারহাট থানায় দায়ের হওয়া মামলা ও মোল্লারহাট থানায় দায়ের হওয়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা।

সূত্র আরও জানায়, বিস্ফোরণের আলামত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তবে প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন হাতে পেলে তদন্ত কার্যক্রম আরও গতি পাবে এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত সহজ হবে।

মাদ্রাসার আড়ালে জঙ্গি তৎপরতা

তদন্ত কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, ২০২২ সালের ১ এপ্রিল মাসিক ১০ হাজার টাকায় জনৈক পারভীন বেগমের কাছ থেকে বাড়িটি ভাড়া নেন মুফতি হারুন নামে এক ব্যক্তি। পরে সেখানে ‘উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’ নামে প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়। তবে মাদ্রাসার আড়ালে সেখানে বোমা তৈরি ও জঙ্গি সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলতো বলে ধারণা তদন্ত সংশ্লিষ্টদের। প্রতিষ্ঠানটি মাদ্রাসা হিসেবে পরিচালিত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে কোনও সন্দেহ তৈরি হয়নি।

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে দীর্ঘদিন কাজ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, এজাহারে উল্লেখিত জেএমজেবি মূলত জেএমবির একটি উপ-সংগঠন ছিল। জেএমবির শীর্ষ নেতা ছিলেন শায়খ আব্দুর রহমান এবং জেএমজেবি পরিচালিত হতো সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে। পরবর্তীকালে সংগঠনটির সদস্যরা ‘নব্য জেএমবি’ নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতাদর্শ অনুসরণ শুরু করে।

ক্রাইম সিন এখনও কর্ডন

এদিকে বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলটি এখনও ‘ক্রাইম সিন’ হিসেবে কর্ডন করে রাখা হয়েছে। বাড়ির মূল মালিক পারভীন বেগম এখনও তার বাড়ির দখল বুঝে পাননি। জনসাধারণের প্রবেশ ঠেকাতে চারপাশে ক্রাইম সিন লেখা হলুদ ফিতা টানানো রয়েছে।

পারভীন বেগমের মেয়ে সোহানা আক্তার মুনিয়া বলেন, “মুফতি হারুনের ছোট বোন আয়েশার সঙ্গে স্থানীয়ভাবে পরিচয়ের সূত্র ধরেই বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। মাদ্রাসা পরিচালনার কথা বলায় বাড়তি খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করতে দেখায় কোনও সন্দেহও হয়নি।” ঘটনার পর প্রকৃত বিষয়টি জানতে পেরে তারা বিস্মিত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, “ঘটনার পর থেকেই পুলিশকে বাড়িটি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। কিন্তু তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্রাইম সিন হিসেবে রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে। আমার বাবা মারা গেছেন, মায়ের বয়স হয়েছে। বাড়ি ভাড়ার টাকাতেই সংসার চলতো। দ্রুত বাড়িটি বুঝিয়ে দিলে আমাদের উপকার হবে।”

এটিইউ’র পুলিশ সুপার (মিডিয়া অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস উইং) মাহফুজুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এখনই বলার মতো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।