মার্ভেল কমিকসের বিখ্যাত চরিত্র হাল্ক। গবেষণাগারে গামা রশ্মির দুর্ঘটনায় ব্রুস ব্যানারের ডিএনএ পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং রাগে সবুজ দৈত্যে পরিণত হন তিনি। কমিকসে এমন অনেক চরিত্র গবেষণাগারের দুর্ঘটনায় অতিমানবীয় ক্ষমতা পায়। কিন্তু বাস্তবে কি সত্যিই এমন ঘটনা ঘটে? কণা ত্বরক যন্ত্রের দুর্ঘটনায় পড়া দুই বিজ্ঞানীর গল্প শোনানো হলো এখানে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রোতভিনো দুর্ঘটনা
আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে, ১৯৭৮ সালের ৩ জুন। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রোতভিনো শহরে অবস্থিত ইউ-৭০ সিনক্রোটন যন্ত্রটি ছিল সে সময়ের সবচেয়ে বড় কণা ত্বরক। প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ বায়ুশূন্য টিউবযুক্ত এই যন্ত্র ৭৬ বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তির প্রোটন রশ্মি উৎপাদন করতে পারত। সেদিন ইনস্টিটিউট ফর হাই এনার্জি ফিজিকসের গবেষক আনাতোলি বুগরস্কি ডিটেকশন সিস্টেমের ত্রুটি সারাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন।
সাধারণত উচ্চ শক্তির গবেষণাগারে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে। কক্ষের বাইরে একটি নিরাপত্তাবাতি জ্বললে বোঝা যায় যন্ত্র চালু আছে। কিন্তু সেদিন বাতিটি নষ্ট ছিল। বুগরস্কি বাতি নিভে থাকায় ভেতরে প্রবেশ করেন এবং কাজ করতে থাকেন। হঠাৎ সিনক্রোটন থেকে ছুটে আসা উচ্চ শক্তির প্রোটন রশ্মি তাঁর মাথার পেছন দিয়ে প্রবেশ করে মস্তিষ্ক ভেদ করে বাঁ নাসারন্ধ্র দিয়ে বেরিয়ে যায়! তিনি নিজে বলেছেন, এত তীব্র আলোর ঝলকানি অনুভব করেছিলেন যে ১ হাজার সূর্যের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল ছিল।
দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে তিনি অসুস্থ হননি, কাজ শেষ করে লগবুক এন্ট্রি করেন। কিন্তু রাতে তাঁর চেহারার বাঁ পাশ ফুলে যেতে থাকে। পরদিন তাঁকে মস্কোর হাসপাতাল নম্বর-৬ এ ভর্তি করা হয়। প্রায় দেড় বছর চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসেন। তবে তিনি বাঁ কানের শ্রবণশক্তি সম্পূর্ণ হারান, সব সময় কানে গুঞ্জন শুনতেন, মাঝেমধ্যে খিঁচুনি ও জ্ঞান হারাতেন। বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০২০ সালে ৭৭ বছর বয়সে অবসর নেন।
ভিয়েতনামের হ্যানয় দুর্ঘটনা
১৯৯২ সালের ১৭ নভেম্বর, হ্যানয় ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিকসে একদল গবেষক উচ্চ শক্তির এক্স-রে উৎপাদন করে স্বর্ণের আকরিকের নমুনায় আপতিত করার পরীক্ষা করছিলেন। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিজেই নমুনাটি যথাস্থানে রাখতে গিয়ে পুনরায় কণা ত্বরক যন্ত্রের কক্ষে প্রবেশ করেন। কিন্তু ইতিমধ্যে অপারেটর যন্ত্র চালু করে দেন। প্রায় ২ থেকে ৪ মিনিট যন্ত্র চলার পর তাঁকে জানানো হলে তিনি বেরিয়ে আসেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর হাত থেকে ৫১১ কিলো ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তির গামা রশ্মি নির্গত হতে দেখা যায়।
প্রথমে তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। দশম দিনে হাত ফুলে গেলে হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রায় দুই সপ্তাহ পর বিকিরণের বিষয়টি বিবেচনায় আসে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ফ্রান্সের প্যারিসে নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর একটি পুরো হাত এবং অন্য হাতের সব কটি আঙুল কেটে বাদ দিতে হয়। ১৯৯৪ সালে প্রায় দুই বছর চিকিৎসা শেষে তিনি হ্যানয়ে ফিরে আসেন।
উপসংহার
কমিকসের সুপারহিরোদের মতো বাস্তবে কণা ত্বরক দুর্ঘটনায় অতিমানবীয় শক্তি পাওয়া যায় না। বরং এ ধরনের দুর্ঘটনা জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। তেজস্ক্রিয়তা বা উচ্চ শক্তির গবেষণায় নিরাপত্তার গুরুত্বই সর্বোচ্চ। বিজ্ঞানী মেরি কুরির মতো আবিষ্কারকেরও নিজের আবিষ্কারই মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। তাই গবেষণাগারে নিরাপদে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি।



