শুনতে কেমন লাগে? মহাভারতের সেই রণক্ষেত্রের কথা ভাবুন, যেখানে কুরুক্ষেত্রের যোদ্ধারা লড়াই শুরুর আগেই টের পাচ্ছেন যে এই যুদ্ধ আসলে তাঁদের নয়, তাঁদের অস্ত্রের। আজ আমরাও ঠিক সেই অস্ত্রের মোহেই মগ্ন; আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ শুধুই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ওপর। অথচ আমরা নিজেদের অস্তিত্বের দিকে তাকাতেই যেন ভুলে গেছি।
কর্মসংস্থানের পরিবর্তন
২০২৩ সালে আইবিএমের সিইও সতর্ক করেছিলেন, হাজার হাজার কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হতে পারে। ডুওলিঙ্গোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ত-মাংসের মানুষকে সরিয়ে সেখানে বসিয়ে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে। ক্লার্না তো আরও চমকপ্রদ দাবি করেছে—তাদের একটিমাত্র এআই সিস্টেম এখন ৭০০ জন মানুষের সমান কাজ একাই সামলে দিচ্ছে। অফিসের দৃশ্যপটটাই যেন বদলে গেছে; এমন এক নতুন কর্মীর আগমন ঘটেছে, যার কোনো ডেস্ক নেই, নেই কোনো বেতনের দায়, অথচ সে সব কাজ নিখুঁতভাবে শেষ করে ফেলছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে একটি আপাতদৃষ্টিতে অকাট্য যুক্তি কাজ করছে: রুটিনমাফিক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং খরচ কমবে। বড় বড় করপোরেট বোর্ডরুমের জন্য এটি একটি আদর্শ সমীকরণ। কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক সূক্ষ্ম অথচ ভয়াবহ বিপদ, যা আমাদের চিন্তার ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
সৃজনশীলতার সমরূপতা
২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, আলাদাভাবে দেখলে এআইয়ের তৈরি গল্পগুলো হয়তো ভীষণ সৃজনশীল মনে হয়। কিন্তু যখন অনেকগুলো গল্প একসঙ্গে রাখা হয়, তখন সেগুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত সমরূপতা ফুটে ওঠে। একে গবেষকেরা বলছেন ট্র্যাজেডি অব দ্য কমনস। সেখানে ব্যক্তিগত লাভের তাড়না শেষ পর্যন্ত সামষ্টিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
চিন্তার একরঙা হয়ে যাওয়া
আমার দৃষ্টিতে এটি কেবল প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা নয়, বরং একধরনের চিন্তার একরঙা হয়ে যাওয়া। সবাই যেন একই বৈচিত্র্যহীন স্বপ্নের অংশ হয়ে পড়ছে, যেখানে ভাষার পার্থক্য থাকলেও মূল সুরটা সেই একই ছাঁচে ঢালা। রবীন্দ্রনাথ আজ বেঁচে থাকলে হয়তো বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, যে যন্ত্র মানুষের কর্ম কেড়ে নেয়, তাকে কি শেষ পর্যন্ত আমরা মানুষের বিকল্প হিসেবে মেনে নেব?
আসুন একটু কল্পনা করি। ভেবে দেখুন, আপনি প্রাচীন মিসরের সমস্ত জ্ঞান আহরণ করে একটি এআই তৈরি করলেন। এরপর পর্যায়ক্রমে গ্রিস, রোম, বাগদাদ এবং ফ্লোরেন্সের জ্ঞান দিয়েও আলাদা আলাদা মডেল তৈরি করলেন। আপনি দেখবেন, প্রতিটি পরবর্তী মডেল আগের চেয়ে অধিকতর বুদ্ধিমান হয়ে উঠছে। কিন্তু এর নেপথ্য কারণ কী?
আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রযুক্তির অ্যালগরিদমে কোনো পরিবর্তন আসেনি; বরং বিবর্তিত হয়েছে মানবসভ্যতা। এর অর্থ দাঁড়ায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত চাবিকাঠি তার প্রোগ্রামিং কোডের গভীরে নয়, বরং তা লুকিয়ে আছে মানবসমাজের সামষ্টিক জ্ঞানের মাঝে। আমাদের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখানেই, যেখানে হয়তো আমরা ভুল অভিমুখে দৃষ্টি দিচ্ছি।
এলএলএম ও মডেল ধস
প্রকৃতপক্ষে এলএলএম বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল কী? এটি কি কোনো অলৌকিক প্রজ্ঞা? এটি তো মানুষের সামাজিক চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির এমন একটি প্রতিচ্ছবি, যেখান থেকে স্বয়ং মানুষকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি কিছুটা আতঙ্কজনক হলেও সত্য। এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন জাগে, যদি সেই সৃজনশীল সামাজিক চিন্তার উৎসই একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়, তবে কী ঘটবে?
মডেল ধসে পড়ার ধারণাটি এখান থেকেই উৎসারিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি কেবল নিজের তৈরি উপাত্ত ব্যবহার করে ক্রমাগত প্রশিক্ষিত হতে থাকে, তাহলে কী দশা হবে? এর ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। প্রান্তিক চিন্তাধারা, প্রথাগত ধারণার বাইরের কোনো অদ্ভুত ভাবনা কিংবা ত্রুটিপূর্ণ হলেও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলো একে একে মুছে যেতে থাকে। দিন শেষে যা টিকে থাকে, তা হলো কেবল একঘেয়ে বা মধ্যম মানের পাণ্ডিত্য।
এটি বাহ্যিকভাবে মসৃণ ও আকর্ষণীয় মনে হলেও এর ভেতরের জ্ঞান আসলে অন্তঃসারশূন্য। এই সংকটকে কেবল কারিগরি সমস্যা হিসেবে দেখার উপায় নেই; এটি মূলত একটি সামাজিক বিপর্যয়।
মানুষের চিন্তাশক্তি হ্রাস
বর্তমান সময়ে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই তথ্যের মূল উৎসে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। আমরা সারসংক্ষেপ পড়ি, সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই এবং গভীর বিতর্ক এড়িয়ে চলি। এর পরিণতিতে আমাদের মধ্যে একধরনের অমূলক আত্মবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে; আমরা আসলে কম জানলেও নিজেদের অনেক বেশি জ্ঞানী বলে মনে করছি।
অ্যানথ্রোপিকের সংগৃহীত উপাত্ত অনুসারে, মাত্র ৮.৭ শতাংশ মানুষ এআই থেকে পাওয়া উত্তরগুলো পুনরায় যাচাই করেন। সহজ কথায়, আমরা আমাদের মৌলিক প্রশ্ন করার সক্ষমতাটি ক্রমান্বয়ে হারিয়ে ফেলছি।
বিপজ্জনক এক নতুন স্তরের মুখোমুখি আমরা। এআই আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও চিন্তার গতিশীলতাকে কি রুদ্ধ করছে না? গবেষণা বলছে, প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এআই ব্যবহারের সময় কোনো প্রকার গঠনমূলক চিন্তা করছে না। তারা কেবল ফলাফলটুকু গ্রহণ করছে, আর সেখানেই ইতি টানছে।
এটা অনেকটা একঘেয়ে অ্যাসেম্বলি লাইনের মতো, যেখানে চিন্তা উৎপাদিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু চিন্তার সেই গভীর অভিজ্ঞতাটুকু অধরাই থেকে যাচ্ছে। নিকোলাস কার একবার বলেছিলেন, গুগল আমাদের স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে; এখন এআই যেন কেড়ে নিচ্ছে আমাদের যুক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা। এক অদ্ভুত প্যারাডক্সের জন্ম হয়েছে, আমরা দ্রুতবেগে ছুটছি ঠিকই, কিন্তু গন্তব্য যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
সোশ্যাল এজ প্যারাডক্স
এখন আসা যাক আসল প্যারাডক্সে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এআইয়ের টিকে থাকার রসদ আসে মানুষের মধ্যকার সামাজিক জটিলতা থেকে। যেমন বিতর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা, এমনকি মানুষের ভুল বা সংঘর্ষ। অথচ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের ফলে এই জটিল সামাজিক মিথস্ক্রিয়াগুলোই আজ হ্রাস পাচ্ছে। সহজ কথায়, এআই যেন নিজের টিকে থাকার ভবিষ্যতের খাদ্য নিজেই নিঃশেষ করে ফেলছে। এই অদ্ভুত সংকটকেই বলা হচ্ছে সোশ্যাল এজ প্যারাডক্স।
আমরা এআইকে কেবল কর্মী ছাঁটাইয়ের হাতিয়ার হিসেবে দেখে মারাত্মক ভুল করছি। প্রকৃতপক্ষে, বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বর্তমানে জুনিয়র স্তরের কর্মীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, অথচ এরাই ছিল আগামীর বিশেষজ্ঞ।
আমাদের অনুধাবন করতে হবে, যে অন্তর্নিহিত জ্ঞান কেবল অভিজ্ঞতা, ভুল থেকে শিক্ষা এবং মেন্টরশিপের মাধ্যমেই অর্জিত হয়, যা কোনোভাবেই এআই দ্বারা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এন্ট্রি-লেভেল পদগুলো শুধু খরচ নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি শেখার প্রক্রিয়া। আজ যদি তাৎক্ষণিক লাভের আশায় আমরা এই পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিই, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমরা বিশাল শূন্যতার মুখোমুখি হব।
গ্রেট রিকোড ও লেগ্যাসি সিস্টেম
আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ পর্যায় হলো গ্রেট রিকোড। আমাদের প্রচলিত ধারণা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবকিছুতে আমূল পরিবর্তন আনবে। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, লেগ্যাসি কোড, প্রাচীন সিস্টেম, ডেটাবেস কিংবা পিডিএফ পার্সারের মতো অনেক অবকাঠামো এখনো এআইয়ের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। এই জটিল অবকাঠামো এআই নিজে থেকে গড়ে তুলতে সক্ষম নয়।
এর ফলশ্রুতিতে আমরা এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছি। পুরোনো কোবল প্রোগ্রামারদের চাহিদা পুনরায় বাড়ছে এবং ডিজিটাল আর্কিওলজির মতো এক অভিনব ক্ষেত্রের জন্ম হচ্ছে, যেখানে পুরোনো সিস্টেমগুলো বুঝতে ও সংস্কার করতে এখনো মানুষের মেধার প্রয়োজন পড়ছে। বস্তুত, প্রতিটি নতুন জ্ঞানই দাঁড়িয়ে থাকে পুরোনো ভিত্তির ওপর। তাই এই দীর্ঘ যাত্রাপথে এআই কখনোই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; বরং এ ক্ষেত্রে মানুষের সাহচর্য ছাড়া এটি একেবারেই অচল।
নেতৃত্বের উত্তল প্রকৃতি
পরিশেষে নেতৃত্বের প্রসঙ্গে আসা যাক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়ে নেতৃত্বও রৈখিক নয়, বরং তা এখন অনেকটা উত্তল প্রকৃতির। এখানে অতি সামান্য পার্থক্যও সুদূরপ্রসারী ও বিশাল প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
যেসব বড় বড় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা কেবল জনবল ছাঁটাইয়ের হাতিয়ার হিসেবে এআইকে বেছে নেবেন, তাঁরা হয়তো সাময়িকভাবে লাভবান হবেন। অন্যদিকে, যাঁরা এআই ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সংযোগ বৃদ্ধির পথ দেখাবেন, তাঁরাই দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় এগিয়ে থাকবেন। কেননা দিন শেষে প্রকৃত মূল্যের জায়গাটি কোথায়, জানেন? তা কেবল যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তায় নয়; বরং মানুষের সুসমন্বিত প্রয়াসের মধ্যেই নিহিত।
উপসংহার
মাঝেমধ্যে আমার মনে এই প্রশ্ন জাগে, এআই কি আমাদের প্রজ্ঞাকে শাণিত করছে, নাকি এটি শুধু আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির এক কৃত্রিম ছায়া হয়ে উঠছে? সম্ভবত বিষয়টি এমন—এআই হলো আমাদেরই একধরনের আয়না। আমরা যেমনটা হব, এআই ঠিক তেমনটাই হয়ে ধরা দেবে; তবে সেই প্রতিচ্ছবি হবে আরও বেশি স্বচ্ছ এবং বৈচিত্র্যহীনভাবে একরঙা।
আসল সংকটটা ঠিক এখানেই। মানুষের বৈশিষ্ট্য কখনোই একরঙা বা রৈখিক ছিল না। আমরা যদি সত্যিই তেমন বৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়ি, তবে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারও আমাদের কাছ থেকে নতুন করে আর কিছুই শেখার থাকবে না। তাই দিন শেষে এই চ্যালেঞ্জটা কেবল প্রযুক্তির উৎকর্ষের নয়; বরং এটি আমাদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতার। আমরা কি এখনো হৃদয়ের টানে মানুষের সঙ্গে কথা বলি, নাকি আমাদের সমস্ত আলাপ আজ কেবল যন্ত্রের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে? ভাবতে হবে বিষয়টি, এখনো দেরি হয়নি।
লেখক: সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, এ. আই. বিহেভিয়োরাল রিসার্চার



