অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে, আইনের প্রয়োগ দুর্বল
অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে, আইনের প্রয়োগ দুর্বল

রাত তখন প্রায় আড়াইটা। সামাজিক একটি ইস্যু নিয়ে ফেসবুকে নিজের মতামত পোস্ট করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার কমেন্ট বক্স ভরে যায় যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, অশ্রাব্য ভাষা আর ধর্ষণের হুমকিতে। এরপর তার পুরোনো ছবি সংগ্রহ করে বিকৃতভাবে সম্পাদনা করে কয়েকটি অচেনা অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টই বন্ধ করে দেন ওই শিক্ষার্থী।

তার ভাষ্য, “শুরুতে ভেবেছিলাম এটা শুধু ট্রলিং। পরে দেখি আমার ছবি এডিট করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তখন বুঝলাম, এটা শুধু অনলাইনের মজা না, আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা।”

প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের অনলাইন উপস্থিতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা, সাইবার হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, ডিপফেক, সাইবারস্টকিং এবং সমন্বিত অনলাইন আক্রমণের ঘটনা। সাম্প্রতিক গবেষণা, পুলিশের তথ্য এবং ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নারীদের জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষণার তথ্য

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের জনসংখ্যা ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএর ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী জীবনের কোনও না কোনও সময়ে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ এবং অপমানের ভয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভুক্তভোগী এসব ঘটনা কোথাও জানান না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এতে আরও বলা হয়েছে, নারী, শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং জেন্ডার বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিরা প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন ক্রমবর্ধমান হারে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা। গবেষণাটি বলছে, বাংলাদেশের প্রতি চারজন নারীর মধ্যে প্রায় তিনজন জীবনের কোনও না কোনও সময়ে সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা এখন বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।

পুলিশের তথ্য

বাংলাদেশ পুলিশের ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ (পিসিএসডব্লিউ) ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধসংক্রান্ত সহায়তা চেয়ে যোগাযোগ করেছেন ৬০ হাজার ৮০৮ নারী। তথ্য বলছে, অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক হয়রানি, বিশেষ করে ফেসবুককে কেন্দ্র করে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৪১ শতাংশ ডক্সিংয়ের (ব্যক্তিগত, সংবেদনশীল বা গোপন তথ্য ফাঁস) শিকার হয়েছেন, ১৮ শতাংশের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে, ১৭ শতাংশ ব্ল্যাকমেইলের মুখে পড়েছেন, ৯ শতাংশ ভুয়া পরিচয়ের শিকার হয়েছেন এবং ৮ শতাংশ সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ করেছেন।

২০২০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পিসিএসডব্লিউ ইউনিটে ভুয়া অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় চুরি এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল হয়রানির হাজার হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ইউনিটটির তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ৪৩ হাজারের বেশি অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও বেশি। ভয়, সামাজিক লজ্জা এবং সচেতনতার অভাবে অনেক নারী অভিযোগই করেন না বলে মনে করছেন তারা।

বিটিআরসির তথ্য

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ জানিয়ে ১৩ হাজার ২৩টি অভিযোগ পেয়েছে কমিশন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ হাজারের বেশি কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী, যা ডিজিটাল পরিসরে নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি ও প্রযুক্তিনির্ভর নির্যাতনের বাড়তি মাত্রা নির্দেশ করে।

ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা

ঢাকার আজিমপুরের এক কলেজছাত্রী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, এক সাবেক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করার পর থেকেই তার হয়রানি শুরু হয়। তিনি বলেন, “প্রথমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে মেসেজ আসতে থাকে। পরে আমার ছবি এডিট করে আমাকে পাঠানো হয়। কাউকে কিছু বলতে পারিনি। মনে হয়েছে, সবাই আমাকেই দোষ দেবে।”

গাজীপুরের এক নারী কনটেন্ট নির্মাতা জানান, লাইভ সেশনে তিনি নিয়মিত যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য পান। পরে তাকে ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারতাম, তারা আমাকে চুপ করিয়ে দিতে চায়। কখনও কখনও ভিডিও বানানোর আগেই ভাবি, আজ আবার কী হবে!”

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন সহিংসতা এখন আর শুধু ‘খারাপ মন্তব্য’ বা ‘ট্রলিং’-এ সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, সম্পাদিত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিপফেক, সাইবারস্টকিং এবং সমন্বিত ডিজিটাল হামলার রূপ নিয়েছে। ‘পারসেপশন অব ডিপফেকস অ্যামং বাংলাদেশি উইমেন’ শীর্ষক ২০২৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ডিপফেক প্রযুক্তি নারীদের মধ্যে নতুন ধরনের ভয় তৈরি করছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যেকোনও সময় তাদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া অশ্লীল ভিডিও বা ছবি তৈরি করা হতে পারে।

পরিস্থিতি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, “বাংলাদেশে নারীরা যখন অনলাইনে দৃশ্যমান হন, মতামত দেন, কনটেন্ট তৈরি করেন বা সামাজিক ইস্যুতে কথা বলেন, তখন তারা প্রায়ই সমন্বিত ডিজিটাল হামলার শিকার হন। এটি মূলত ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের একটি রূপ।” তিনি আরও বলেন, “অনলাইন সহিংসতাকে এখনও অনেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। কিন্তু এটি নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস এবং সমাজে অংশগ্রহণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।”

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি ভাইরাল ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পোশাক, মতামত বা রাতে চলাফেরাকে কেন্দ্র করে নারীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অনলাইন বিদ্বেষ ও অপমানজনক মন্তব্য এখন অনেক বেশি সাধারণ হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে দুই নারীকে হয়রানি ও অপদস্থ করার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক নারীবিদ্বেষী মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অনলাইন হয়রানি এখন অফলাইন সহিংসতার ঝুঁকিও তৈরি করছে। নারী সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, কনটেন্ট নির্মাতা এবং মানবাধিকার রক্ষাকর্মীরা বিশেষভাবে টার্গেট হচ্ছেন। অনলাইন ও এআইনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা নিয়ে ইউএন উইমেনের ২০২৫-২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তি নারী সাংবাদিক ও জনসম্মুখে থাকা নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতাকে আরও “সংঘবদ্ধ ও বিপজ্জনক” করে তুলছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের এক-তৃতীয়াংশ অনলাইনে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণের শিকার হয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে অনেকেই অফলাইনে হুমকি ও হয়রানির মুখে পড়েছেন। ইউএন উইমেন আরও বলছে, ডিজিটাল সহিংসতা এখন ‘স্ক্রিন থেকে বাস্তব জীবনে’ ছড়িয়ে পড়ছে, যা নারীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনপরিসরে অংশগ্রহণ সীমিত করছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন অনলাইন হামলার মুখে থাকলে উদ্বেগ, আতঙ্ক, অনিদ্রা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মবিশ্বাস হারানোর মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। এমনকি কারও কারও পড়াশোনা বা চাকরিতেও ব্যাঘাত ঘটে। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. শাহানা পারভীন বলেন, “নিয়মিত অনলাইন যৌন হয়রানি বা হুমকি দীর্ঘস্থায়ী ভয়ের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। অনেক নারী মোবাইল ব্যবহার করতেও ভয় পান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এড়িয়ে চলেন।”

সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতা প্রায়ই ‘চরিত্র বিচার’-এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোনও নারীর ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস হলে অপরাধীর বদলে অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, যা তাদের ওপর দ্বিগুণ মানসিক চাপ তৈরি করে। নারী অধিকারকর্মী নাজমা বেগম বলেন, “আমাদের সমাজে এখনও নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ফলে অপরাধীরা শক্ত সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়ে না।”

আইনি কাঠামো

বাংলাদেশে অনলাইন হয়রানি, ডিপফেক, ছবি ফাঁস, ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া পরিচয়, সাইবারস্টকিং এবং যৌন হয়রানি মোকাবিলায় কয়েকটি আইন রয়েছে। এসব আইনে কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩

বাংলাদেশে ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলার প্রধান আইন হলো সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩। এই আইনে বিভিন্ন ধরনের অনলাইন অপরাধকে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। কারও ছবি বা তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয় বা অ্যাকাউন্ট তৈরি করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশ বা ছড়িয়ে দিলে দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। অনলাইন হুমকি, সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি এবং ব্ল্যাকমেইলও এই আইনের আওতায় দণ্ডনীয়। হ্যাকিং, তথ্য চুরি বা ডিজিটাল প্রতারণার ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তিন থেকে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২

এই আইনের আওতায় অনুমতি ছাড়া অশ্লীল ছবি বা ভিডিও তৈরি, সংরক্ষণ, প্রকাশ বা বিতরণ দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রথম অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে সাজা ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। ডিপফেক, রিভেঞ্জ পর্ন বা ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁসের ঘটনাও এই আইনের আওতায় পড়তে পারে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন

অনলাইনে ধর্ষণের হুমকি, যৌন হয়রানি বা গুরুতর মানসিক নির্যাতনের কিছু ঘটনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় বিচারযোগ্য হতে পারে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০

মানহানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অশ্লীলতা, যৌন হয়রানি এবং ব্ল্যাকমেইলসহ বিভিন্ন অনলাইন অপরাধ মোকাবিলায় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা ব্যবহার করা হয়। অপরাধ অনুযায়ী জরিমানা থেকে শুরু করে কয়েক মাস বা কয়েক বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

সাইবার ট্রাইব্যুনাল

বাংলাদেশে ডিজিটাল অপরাধের বিচার পরিচালনার জন্য বিশেষ সাইবার ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এসব ট্রাইব্যুনালে অনলাইন হয়রানি, ছবি ফাঁস, হ্যাকিং, ব্ল্যাকমেইল এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার মামলার বিচার হয়। তবে আইনি কাঠামো থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ এখনও দুর্বল।

আইন প্রয়োগের চ্যালেঞ্জ

মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি এখনও চ্যালেঞ্জিং। সামাজিক লজ্জা ও ভয়ের কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ জানাতে এগিয়ে আসেন না। পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিটের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ শরীফ আহমেদ বলেন, “অনলাইন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল এবং সম্পাদিত বা বিকৃত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আমরা প্রতিদিন পাই। প্রথমে আমরা ডিজিটাল প্রমাণ যাচাই করি। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ এবং ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্লকের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযুক্ত শনাক্ত হলে আইনি ব্যবস্থা ও গ্রেফতার করা হয়।” তিনি আরও বলেন, “তদন্ত প্রক্রিয়ায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব, ভুক্তভোগীর দেরিতে অভিযোগ করা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘাটতির কারণে অনেক মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত করা যায় না।”

এ বিষয়ে নাজমা বেগম বলেন, “তদন্তে বিলম্ব, ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও বিদেশি সার্ভারের ব্যবহার, এবং ডিপফেকের মতো নতুন প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ শনাক্তের সীমাবদ্ধতা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।”

সহায়তা ব্যবস্থা

এদিকে বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, নারীদের সহায়তায় ২৪ ঘণ্টার বিশেষ সাইবার হেল্পলাইন চালু রয়েছে। হটলাইন নম্বরগুলো হলো ০১৩২০-০০২০০১, ০১৩২০-০০২০০২ এবং ০১৩২০-০০২২২২। এছাড়া ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ ইউনিট তাদের ফেসবুক পেজ ও হটলাইন নম্বরের (০১৩২০০০০৮৮৮) মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ করছে।

তবে নারী অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হটলাইন চালু করলেই হবে না। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা, দ্রুত তদন্ত ও বিচার, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীবান্ধব সহায়তা ব্যবস্থা জরুরি। বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের সাবেক সভাপতি শাহিদা আখতার বলেন, “অনলাইন সহিংসতাকে এখনও সমাজের বড় একটি অংশ ‘ভার্চুয়াল সমস্যা’ হিসেবে দেখে। কিন্তু বাস্তবে এটি নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।”

তিনি আরও বলেন, “একটি সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নারীদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি মানবাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণেরও প্রশ্ন।”