পুরো বিশ্বজুড়ে এক রহস্যময় নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ বা লো-ফ্রিকোয়েন্সি সাউন্ড নিয়ে বাড়ছে আতঙ্ক। 'গ্লোবাল হাম' নামে পরিচিত এই শব্দটির উৎস নিয়ে বিজ্ঞানীরা দশকের পর দশক গবেষণা করলেও আজও তা অমীমাংসিত। বিশ্বের মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ মানুষ এই অদ্ভুত আওয়াজ শুনতে পান, যা তাদের কাছে অনেকটা দূর থেকে আসা ডিজেল ইঞ্জিনের শব্দের মতো মনে হয়।
শ্রোতাদের অভিজ্ঞতা
যারা এই শব্দ শোনেন, তাদের বলা হয় হিয়ারার বা শ্রোতা। তাদের দাবি, এটি কেবল ক্ষীণ কোনো শব্দ নয়, বরং এটি তারা শরীরে সরাসরি অনুভব করতে পারেন। এর প্রভাবে দীর্ঘদিনের অনিদ্রা, মাথাব্যথা এবং এমনকি মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন অনেকে। রাতের নিস্তব্ধতায় এই আওয়াজ আরও তীব্র হয়, যা শরীরে কম্পন সৃষ্টি করে এবং বমি বমি ভাবের উদ্রেক ঘটায়।
গবেষণা ও উৎস সন্ধান
ইউনিভার্সিটি অব সাউদ্যাম্পটন এবং ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) দীর্ঘদিন ধরে এর উৎস খোঁজার চেষ্টা করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সী এবং বয়স্ক ব্যক্তিরাই এই শব্দ বেশি শোনেন। গ্লোবাল হামের জন্য বিশ্বে তিনটি জায়গা সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর তাওস হাম সবচেয়ে বিখ্যাত। নব্বইয়ের দশকে সেখানকার মানুষ এই শব্দে এতটাই অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল যে মার্কিন কংগ্রেসকে তদন্ত শুরু করতে হয়েছিল। যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল হাম এবং কানাডার ওন্টারিওর উইন্ডসর হাম এই রহস্যের অন্য দুটি কেন্দ্র।
তত্ত্বসমূহ
বিজ্ঞানীরা এই শব্দের পেছনে বেশ কিছু তত্ত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো মাইক্রোসিসমিক বা সমুদ্রের তলদেশের কম্পন। ধারণা করা হয়, সমুদ্রের ঢেউ যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে আঘাত করে, তখন এক ধরণের নিচু কম্পাঙ্ক তৈরি হয় যা সংবেদনশীল শ্রবণক্ষমতার মানুষ শুনতে পান। দ্বিতীয় আরেকটি তত্ত্ব হলো শিল্পকারখানার প্রভাব। বড় বড় গ্যাস লাইন, ইলেকট্রিক্যাল ট্রান্সফরমার বা বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্যান থেকে তৈরি কম্পন মাটির ভেতর দিয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে। চলতি বছরের মার্চে নিউ জার্সির ভাইনল্যান্ডে একই ধরণের রহস্যময় গুঞ্জন শোনা গেছে, যার জন্য সেখানকার একটি বিশাল ডাটা সেন্টারকে দায়ী করছেন বাসিন্দারা।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গ্লোবাল হাম মানুষের শ্রবণক্ষমতার একেবারে শেষ সীমায় অবস্থান করে। সাধারণ মাইক্রোফোনে এই ক্ষীণ শব্দ ধরা পড়ে না এবং অন্যান্য প্রাত্যহিক শব্দের ভিড়ে এটি হারিয়ে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা টিনিটাস বা কানের ভেতরে বাজার মতো সমস্যার কথা বললেও এটি তার চেয়ে আলাদা। কারণ টিনিটাস হলো উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ, আর গ্লোবাল হাম নিচু ফ্রিকোয়েন্সির।
হতাশাজনক হলেও সত্য যে, চিকিৎসাবিদ বা সাধারণ মানুষ একে পাত্তাই দিতে চায় না। কিন্তু ভুক্তভোগীরা নিশ্চিত যে এই অদৃশ্য অভিজ্ঞতা একদম বাস্তব। ভৌগোলিক নাকি শিল্পকারখানার সৃষ্টি, সেই বিতর্ক ছাপিয়ে 'গ্লোবাল হাম' আজও আধুনিক বিজ্ঞানের এক অমীমাংসিত ধাঁধা হয়ে আছে।



