প্রযুক্তি সহিংসতা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
প্রযুক্তি সহিংসতা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ১৩ এপ্রিল বিএনএনআরসি আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং তার কার্যকর প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি

বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে সাইবার সুরক্ষা আইন, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৬-এর মতো আইন থাকলেও সাধারণ মানুষ এ সম্পর্কে সচেতন নয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, 'আইনগুলো নতুন, বাস্তবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। মূল সমস্যা হলো মানুষ আইন ও সুবিধাগুলো জানে না।'

ভুক্তভোগীদের অবস্থা ও প্রতিকার

সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, '২০১৮ সালে আমার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়। অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পাইনি; বরং টাকা চেয়ে ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব আসে।' তিনি আরও বলেন, 'সাইবার বুলিংয়ের শিকার ৮৮ শতাংশের কোনো প্রতিকার নেই।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, 'আমরা শুধু ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া না দিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে চাই। তবে আইনি প্রক্রিয়া, আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার জটিলতা আমাদের সীমাবদ্ধতা।'

সচেতনতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের তাগিদ

বাংলাদেশ উইমেন ইন আইটির সাবেক পরিচালক কানিজ ফাতেমা বলেন, '৭৮ শতাংশ নারী প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানির শিকার হন, কিন্তু ৮৮ শতাংশ আইনি সহায়তা নেন না। মূল সমস্যা ভুক্তভোগী ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে বিচ্ছিন্নতা।'

শান্তি মিত্র সমাজ কল্যাণ সংস্থার সানজানা আফরোজ বলেন, 'আমার জেলায় প্রশিক্ষণের পর দেখি, অনেক নারীই বুঝতে পারেন না যে তারা ডিজিটাল সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা দরকার।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি

বিটিআরসির যুগ্ম সচিব মো. মেহেদি–উল সহিদ জানান, ২০২৫ সালে বিটিআরসি ১,৩২৩টি কনটেন্ট অপসারণের অনুরোধ করে, যার ৯২.৪৪ শতাংশ অপসারণ হয়েছে। তবে তিনি বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর গাইডলাইন সবসময় আমাদের দেশীয় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।'

বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরামের সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল হক বলেন, 'এআই ব্যবহার করে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার এখন সাধারণ হয়ে উঠছে। তাই এআই–ভিত্তিক আইন ও নীতি প্রণয়ন জরুরি।'

সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা

বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, 'প্রযুক্তিসহায়ক জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা শুধু অনলাইন নয়, অফলাইনেও ঘটে। তাই নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা, বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিত করা এবং সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।'

বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মাসুদা ইয়াসমিন বলেন, 'প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা একটি বহুমাত্রিক বিষয়, যেখানে সামাজিক, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় এবং সরকারি-বেসরকারি সব পক্ষের সমন্বিত দায়িত্ব জরুরি।'

সুপারিশ

  • প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ জোরদার করা।
  • সুস্পষ্ট নীতি, কার্যকর আইন প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করা।
  • প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও প্রতিকারব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
  • বিদ্যমান আইন–নীতিতে টিএফজিবিভিকে পৃথক ও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা।
  • প্রতিরোধ, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিন্ন ধারণা প্রতিষ্ঠা করা।
  • ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ, সহজ ও দ্রুত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
  • আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করা।
  • ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করার সংস্কৃতি জোরদার করা।
  • সচেতনতা কার্যক্রমকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে নিয়মিত কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা।
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রচার জোরদার করা।
  • গণমাধ্যম ও কমিউনিটিকে সচেতনতা কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা।
  • সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেট সেবাদাতাদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা।
  • ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ ও অভিযোগ নিষ্পত্তিতে জবাবদিহি বাড়ানো।
  • জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সমন্বয় জোরদার করা।
  • জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা।
  • আইসিটি ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ কমিটিতে টিএফজিবিভি অন্তর্ভুক্ত করা।
  • স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ ও মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
  • অভিযোগ সহায়তা ও সচেতনতা কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা।