মোবাইল গেমের প্রতি ‘অনুরাগ’ই কি প্রজন্ম আলফার পরিবর্তিত মননের পেছনের নিয়ামক? প্রশ্নটি আমার মাথায় আসে নিজের ছেলেকে বিদ্যালয়ে দেওয়ার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। তিনবার বিদ্যালয় বদলের পথে পরিচিত অভিভাবকেরা যখন নিজ নিজ সন্তানের পরিবর্তিত আচরণের পেছনে বারবার মোবাইল গেমের দিকে আঙুল তোলেন, তখন থেকেই এই অন্বেষণের শুরু। উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, প্রশ্নটি যত সহজ মনে হচ্ছে, এর ব্যাখ্যাটা মোটেও ততটা সরল নয়।
‘আসক্তি’ নয়, ‘অনুরাগ’ কেন?
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে, অনেকেই তো গেমের প্রতি ‘আসক্তি’ শব্দ ব্যবহার করেন, তাহলে আমি কেন ‘অনুরাগ’ শব্দ ব্যবহার করলাম? আসলে ‘আসক্তি’ বললেই একধরনের নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। বর্তমানে সামাজিক মিডিয়ার কোনো প্ল্যাটফর্মকেই নেতিবাচক হিসেবে দেখার উপায় নেই। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, যাতায়াত প্রভৃতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে এই মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছি। আর প্রজন্ম আলফার কাছে মোবাইল গেম কেবল অবসরের সঙ্গীই নয়, বরং এটা তাদের সামাজিক জীবন, বন্ধুত্ব এবং নিজেকে উন্মোচন করার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সুতরাং এই দাবিটা এখানে করাই যায় যে গেম এই প্রজন্মের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটা অংশেই পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণায় দেখা গেছে, ভিডিও গেম খেলা ৭২ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর কাছে গেম খেলার একটি অন্যতম কারণ হলো অন্যদের সঙ্গে সময় কাটানো। আর তাদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ জানিয়েছে, গেম খেলতে গিয়ে তারা অনলাইনে বন্ধুও তৈরি করেছে (গটফ্রিড ও সিদোতি ২০২৪)। ২০২৫ সালের আরও একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা গেমে একধরনের ভার্চ্যুয়াল রূপ তৈরি করার মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে (ম্যাকক্রিন্ডল ও ফেল ২০২০)।
আবার প্রজন্ম আলফা—যাদের জন্ম সাল ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে, এখন তারা তাদের শৈশবকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং এটুকু বলাই যায়, সর্বোচ্চ ১৪ বছরের একটা শিশু এটাকে নিতান্তই একটা ‘খেলা’ হিসেবেই গ্রহণ করে এবং রঙিন ও বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যের জন্যই ক্রমেই এটার প্রতি তার একধরনের ঝোঁক তৈরি হয়। এটা কখনোই ‘আসক্তি’ নয়। এটাকে গেমের প্রতি তাদের অনুরাগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। অনুরাগ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ থেকে এসেছে। ‘অনু’ শব্দের অর্থ অনুসরণ বা সান্নিধ্য এবং ‘রাগ’ শব্দের অর্থ আবেগ বা উষ্ণতা। এই দুই উপাদান একত্রে ‘অনুরাগ’ শব্দটি গঠন করে, যার মাধ্যমে বোঝানো হয় এমন এক আবেগ, যা কোনো ব্যক্তি, বস্তু, আদর্শ বা সৃষ্টির প্রতি গভীর আকর্ষণ ও ভালোবাসা থেকে উৎসারিত হয়।
গেমের প্রতি অনুরাগ কখন আসক্তিতে পরিণত হয়?
কিন্তু এর বিপরীতেও একটা যুক্তি আছে। মানুষ আসক্ত হয় তার ভেতরের ‘প্রোথিত ভীতি কিংবা যন্ত্রণা’ থেকে। শিশুর বিকাশ এবং মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করা কানাডিয়ান চিকিৎসক ডা. গাবোর মেইট আসক্তির পেছনের কারণ হিসেবে এটাকে উল্লেখ করে বলেছেন, মনোযোগ কম পাওয়া, একাকিত্ব আর মানসিক চাপের জন্য মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, যাদের শৈশব খুব খারাপ কেটেছে, তাদের বেশির ভাগের নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে (ল্যাং ২০১৯)। অর্থাৎ একটা শিশুর শৈশবের নেতিবাচক অবস্থা তার নেশাগ্রস্ত হয়ে ওঠার কারণ। অর্থাৎ বলা যায়, গেমের প্রতি একটা শিশুর অনুরাগ নিয়ন্ত্রণ হারালে সেটা ‘আচরণগত আসক্তি’তে পরিণত হতে পারে। এখানে ‘আচরণগত’ শব্দটা লক্ষণীয়। এ ক্ষেত্রে মাদক বা অ্যালকোহলের মতো কোনো রাসায়নিক পদার্থ ছাড়াই শুধু একটা কাজ ব্যক্তি আচরণে আসক্তি তৈরি করছে। এ জন্য এ ধরনের আসক্তিকে ‘আচরণগত আসক্তি’ বলাটাই শ্রেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিভাগের ১১তম সংস্করণে গেমিং ডিজঅর্ডারকে এই শ্রেণিতেই রেখেছে (স্কুটি ২০১৭)। সুতরাং এই আচরণগত আসক্তির প্রবণতাকে ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
অভিভাবকদের পর্যবেক্ষণ ও পাঁচটি ঘটনা
যাহোক, এই অভিভাবকেরা তাঁর পরিবারের প্রজন্ম আলফার অন্তর্ভুক্ত সদস্যের পরিবর্তিত যে আচরণগত বৈশিষ্ট্যগুলোর উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর একটা তালিকা করলে দেখা যায়: শিশু জেদি, কথা শুনতে চায় না, অবাধ্য ও একগুঁয়ে, শাসন কোনো প্রভাব ফেলে না, নিজের মতো কাজ করতে চায়, বিদ্রোহী আচরণ করে, সবকিছু দ্রুত করতে চায় ও অধৈর্য এবং বড়দের গুরুত্ব দেয় না। আর কোনো ধরনের দ্বান্দ্বিকতা এবং দ্বিধাগ্রস্ততা ছাড়াই এই আচরণগুলোর জন্য তারা মোবাইলে খেলা গেমকে কারণ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন। বর্তমান এই নিবন্ধে এই বিষয়টাকেই খুঁটিয়ে দেখার প্রয়াস চালানো হয়েছে।
প্রথম ঘটনা: গেম খেলতে মোবাইল না পেয়ে হত্যা
২০২১ সালের ৯ মে নাটোরের গুরুদাসপুরে সাত বছরের শিশু মহিবুল্লাহকে কুপিয়ে হত্যা করে তার সহপাঠী ১১ বছরের নয়ন মিয়া। পুলিশ জানায়, নয়ন পূর্বে মহিবুল্লাহর কাছে মোবাইল চেয়েছিল গেম খেলার জন্য, কিন্তু না পাওয়ায় ক্ষোভ জমা করে। ঘটনার দিন সে মহিবুল্লাহকে পাখির বাসা দেখানোর কথা বলে ভুট্টাখেতে নিয়ে যায়, প্রথমে শ্বাসরোধ করে, ব্যর্থ হলে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।
দ্বিতীয় ঘটনা: গেম খেলতে না পেয়ে আত্মহত্যা
২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জাগো নিউজের খবরে দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে আট বছরের শিশু ইয়ামিন মোবাইলে গেম খেলতে মায়ের কাছে মোবাইল চায়। পড়াশোনার ক্ষতি হওয়ায় মা ‘না’ বললে সে খালি ঘরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।
তৃতীয় ঘটনা: গেম খেলতে নিষেধ করায় বাসা ছাড়া
২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ১১ বছরের শিশু রাইমুল হাসান ওরফে সাইমুম মোবাইলে গেম খেলতে না পেয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। চার মাস পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, বাবা তাকে গেম খেলার জন্য বকাঝকা করতেন এবং মোবাইল রেখে যেতেন না, তাই অভিমান করে বাসা ছেড়েছিল।
চতুর্থ ঘটনা: গেম দেখে শরীরে আগুন
২০২৪ সালের ৩০ মার্চ গাজীপুরের উত্তর ছায়াবীথিতে ছয় বছর বয়সী শিশু রাফিয়া মুনতাহা মোবাইল গেমে দেখে নিজেও শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে স্মার্ট টিভি ও মোবাইলে গেম দেখত এবং চরিত্র অনুকরণ করতে চেয়েছিল। ঘটনায় তার শরীরের ১২ শতাংশ পুড়ে যায়।
পঞ্চম ঘটনা: গেমের প্রলোভনে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা
২০২৫ সালে বগুড়ার শেরপুরে আট বছরের শিশুকন্যাকে মোবাইলে গেম খেলানোর প্রলোভন দেখিয়ে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা করা হয়। এলাকার এক কিশোর তাকে অন্ধকার গলিতে নিয়ে যায়। শিশুটি গেম খেলার লোভে রাজি হয়েছিল।
এই পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রজন্ম আলফার মধ্যে ইগো, অভিমান, আত্মসম্মানবোধ প্রকট। মা-বাবার প্রতিক্রিয়া তাদের আত্মসম্মানে আঘাত করে। শিশুর মনস্তত্ত্ব এখন পুরোটাই প্রযুক্তি নির্ভর; তারা পরিবার ও সমাজের চেয়ে ডিভাইস থেকে বেশি শিখছে। মোবাইল গেমের কিছু বৈশিষ্ট্য শিশুর মনন পরিবর্তনে সহায়ক, তবে প্রশ্ন হলো এটি প্রধান কারণ নাকি কেবল একটি উদ্দীপক?
গেমের প্রতি আকর্ষণের পেছনের বিজ্ঞান
ভিডিও গেমগুলো তৈরি করা হয় ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ এর মাধ্যমে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণে খেলোয়াড় পুরস্কার পায়, কিন্তু তা অপ্রত্যাশিত। এতে শিশুরা বারবার খেলতে চায়। মায়ো ক্লিনিক হেলথ সিস্টেমের মতে, গেম খেলার সময় শরীর থেকে ডোপামিন নিঃসৃত হয়, যা আনন্দ ও প্রেরণা জাগায়। শিশুরা যত বেশি গেমে আগ্রহী হয়, তত বেশি ডোপামিন নিঃসৃত হয় এবং তারা গেমটি বেশি খেলতে চায়। হার্ভার্ড সেন্টার ফর দ্য ডেভেলপিং চাইন্ডের গবেষণা অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে শিশুর মস্তিষ্কের ৯০ শতাংশ বিকশিত হয়। তাই গেমের প্রভাব অত্যন্ত গভীর হতে পারে।
মিডিয়ার প্রভাব: টেলিভিশন থেকে গেম
১৯৬০ সালে জোসেফ ক্যাপলার দেখান যে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াদি মিডিয়ার প্রভাবের মধ্যস্থতা করে। ১৯৬১ সালে আলবার্ট বান্দুরা প্রমাণ করেন যে শিশুরা অনুকরণের মাধ্যমে আচরণ শেখে। ১৯৭২ সালে ট্যানিস ম্যাকবেথ উইলিয়ামসের গবেষণায় দেখা যায়, টেলিভিশন আসার পর শিশুদের মধ্যে শারীরিক ও মৌখিক আগ্রাসন বেড়ে যায়। টেলিভিশন একমুখী মাধ্যম, কিন্তু মোবাইল গেম দ্বিমুখী ও অংশগ্রহণমূলক, তাই এর প্রভাব আরও বিস্তৃত।
উপসংহার
প্রজন্ম আলফার আচরণগত পরিবর্তনের জন্য শুধু মোবাইল গেমকে দায়ী করা সরলীকরণ হবে। এর পেছনে রয়েছে পারিবারিক কাঠামো, আর্থসামাজিক অবস্থা, প্রযুক্তির প্রতি নির্ভরশীলতা এবং মিডিয়ার জটিল প্রভাব। তবে গেম একটি শক্তিশালী উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে, যা শিশুর মননে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান আলোচনায় শুধু বর্তমানকে অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়েছে; ভবিষ্যতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।



