স্মার্টফোন আসক্তি: দিনে কতবার ফোন চেক করেন আপনি?
স্মার্টফোন আসক্তি: দিনে কতবার ফোন চেক করেন?

স্মার্টফোন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে বিভিন্ন গবেষণা বলছে, প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি সময় মানুষ ফোনের দিকে তাকাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভ্যাস ধীরে ধীরে মনোযোগ, ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।

ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমানো পর্যন্ত ফোন

ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম কাজ কী? অনেকের উত্তর একটাই—মোবাইল ফোন হাতে নেওয়া। আবার রাতে ঘুমানোর আগের শেষ কাজও প্রায় একই। দিনের পুরোটা সময় যেন ফোনকে ঘিরেই কাটছে মানুষের জীবন। বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ফোন চেক করার প্রবণতাও। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রযুক্তি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, একজন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী দিনে গড়ে কয়েক ডজন থেকে শতাধিকবার পর্যন্ত ফোন চেক করেন।

গড়ে কতবার ফোন চেক করেন ব্যবহারকারীরা?

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মোবাইল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘টেক২১’-এর এক জরিপে বলা হয়, গড় ব্যবহারকারীরা দিনে প্রায় ৮০ বার ফোন চেক করেন। অন্যদিকে, মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিভিউড’-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০ বার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ‘ডেলয়েট গ্লোবাল মোবাইল কনজ্যুমার সার্ভে’-তেও উঠে আসে একই ধরনের প্রবণতা। সেখানে বলা হয়েছিল, তরুণ ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ ঘুম থেকে ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফোন ব্যবহার শুরু করেন এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে বারবার ডিভাইসটি পরীক্ষা করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেন বারবার ফোন চেক করেন আমরা?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফোন চেক করার এই প্রবণতা সবসময় প্রয়োজনের কারণে হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই এটি অভ্যাসগত আচরণে পরিণত হয়েছে। নতুন নোটিফিকেশন, মেসেজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও আপডেট এসেছে কি না—এই কৌতূহল মানুষকে বারবার ফোনের দিকে টেনে নেয়। মনোবিজ্ঞানীরা এই আচরণকে ‘কমপালসিভ চেকিং’ বা বাধ্যতামূলক চেকিং প্রবণতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপগুলোর নোটিফিকেশন ব্যবস্থা মানুষের মস্তিষ্কে ক্ষণস্থায়ী আনন্দ বা ‘ডোপামিন রেসপন্স’ তৈরি করে। ফলে অনেকেই অজান্তেই ঘন ঘন ফোন চেক করেন।

ডোপামিন রিওয়ার্ড সিস্টেম ও ফোমো

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোন বারবার চেক করার পেছনে কাজ করে কয়েকটি মানসিক ও আচরণগত কারণ। এর মধ্যে অন্যতম ‘ডোপামিন রিওয়ার্ড সিস্টেম’। নতুন কোনও নোটিফিকেশন, মেসেজ বা লাইক দেখলে মস্তিষ্কে স্বল্পমেয়াদী আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়। ফলে মানুষ বারবার ফোন দেখতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এছাড়া রয়েছে ‘ফোমো’ বা ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’। অর্থাৎ, গুরুত্বপূর্ণ কোনও খবর, আপডেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় পিছিয়ে পড়ার ভয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানসিক চাপও মানুষকে ঘন ঘন ফোন চেক করতে উৎসাহিত করে।

অভ্যাসে পরিণত হওয়া

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আচরণ অনেকের ক্ষেত্রে অভ্যাসে পরিণত হয়। এমনকি কোনও নোটিফিকেশন না এলেও অনেকে অজান্তেই ফোন আনলক করে স্ক্রিন দেখেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন একই আচরণ চলতে থাকলে তা স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষা, বিনোদন, যোগাযোগ, গেমিং—সবকিছু একই ডিভাইসে চলে আসায় ফোন থেকে দূরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার এবং ঘন ঘন স্ক্রিন চেক করার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে মনোযোগ কমে যাওয়া, কাজের ব্যাঘাত, ঘুমের সমস্যা এবং মানসিক চাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন গবেষণাতেও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ও মানসিক চাপে সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার ঘুমের স্বাভাবিক চক্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রয়োজন সচেতনতা

তবে প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, স্মার্টফোন নিজে সমস্যা নয়; মূল বিষয় হচ্ছে ব্যবহারের ধরন। প্রয়োজনের বাইরে অচেতনভাবে ফোন চেক করার অভ্যাস কমাতে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। কারণ, অনেকেই হয়তো বুঝতেই পারছেন না—দিনের কতটা সময় নীরবে চলে যাচ্ছে কেবল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে।