সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সংলাপে অতিথি ও আলোচকেরা। আজ বুধবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে এই সংলাপের আয়োজন করে দৃক, নাগরিক কোয়ালিশন ও জাতিসংঘের ইলেকটোরাল প্রজেক্ট ‘ব্যালট’সহ আরও কয়েকটি সংস্থা।
দেশের সাইবার জগতে বটের আধিপত্য
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দাবি করেছেন, দেশের সাইবার–জগতের মোট ট্রাফিকের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপ। তিনি বলেন, এই বাস্তবতা না বুঝে ‘সাইবার বুলিং’ বা অনলাইন প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ঝুঁকি থেকে যায়।
‘মাল্টি-স্টেকহোল্ডার ডায়ালগ অন সাইবার সিকিউরিটি লেজিসলেশন, ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন অ্যান্ড প্ল্যাটফর্ম গভর্ন্যান্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংলাপে দেওয়া বক্তব্যে এ তথ্য তুলে ধরেন রেহান আসিফ আসাদ। আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে এই সংলাপের আয়োজক দৃক, নাগরিক কোয়ালিশন ও জাতিসংঘের ইলেকটোরাল প্রজেক্ট ‘ব্যালট’সহ আরও কয়েকটি সংস্থা।
সাম্প্রতিক সময়ের অনলাইন ট্রাফিক বিশ্লেষণের তথ্য তুলে ধরে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, অনলাইনে মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া ও ইন্টার্যাকশনের বড় অংশই প্রকৃত ব্যবহারকারীর নয়। অর্গানিক বনাম নন-অর্গানিক ট্রাফিক আলাদা করতে না পারলে সমস্যার মূল জায়গা চিহ্নিত করা কঠিন।
সরকারের দিক থেকে এটি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বড় প্ল্যাটফর্মগুলোও এ সমস্যার কথা স্বীকার করেছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা বিপুলসংখ্যক ‘বট অ্যাকাউন্ট’ বন্ধ করেছে। তবে তিনিও স্বীকার করছেন দেশের সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। সরকারি ও বেসরকারি—দুই খাতেই বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত তথ্যের বড় অংশ বেসরকারি খাতে সংরক্ষিত থাকায় শুধু সরকারি খাত সুরক্ষিত করলেই নাগরিকেরা নিরাপদ থাকবে না। বিষয়টি নিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আইন প্রয়োগে ‘অনলাইন-অফলাইন’ একই মানদণ্ডের আহ্বান
বাংলাদেশে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ, সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা—এই তিনটি বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণের ওপর জোর দেন ইউনেসকোর ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন, মিডিয়া রেগুলেশন অ্যান্ড ডিজিটাল গভর্ন্যান্স বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ জোয়ান বারাতা। সংলাপে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ, সে জন্য আইন প্রণয়নেও সেই মানদণ্ড প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
সাইবার অপরাধ দমনের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয় বলে উল্লেখ করেন জোয়ান বারাতা। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে সংঘটিত বক্তব্যকে আলাদা করে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলে তা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করে। যা অফলাইনে অবৈধ, তা অনলাইনেও অবৈধ—এর বেশি কিছু নয়, কমও নয়।’ সে জন্য এ–সংক্রান্ত আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘অনলাইন-অফলাইন’ একই মানদণ্ড মানার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
অস্পষ্ট ও বিস্তৃত সংজ্ঞা—যেমন ‘গুজব ছড়ানো’ বা ‘অসত্য তথ্য প্রচার’—আইনে অন্তর্ভুক্ত হলে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে উল্লেখ করেন জোয়ান বারাতা। পাশাপাশি সাইবার আইন প্রয়োগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কিছু সীমা থাকা প্রয়োজন, যা মূলত সমাজকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। একই সঙ্গে এসব সীমা যেন মানুষের মতপ্রকাশের অধিকারকে অযথা খর্ব না করে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
সুজান ভাইজ বলেন, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি কার্যকর ‘প্রটোকল’ থাকা জরুরি, যাতে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়। কোনো ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিলে একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা সমাধানের সুযোগ থাকতে হবে। প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আলাদা, তাই সবার কথা শোনা গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়ন্ত্রণহীনতা অনলাইন সহিংসতা বাড়াতে পারে
সংলাপে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিটিআরসি সরাসরি কনটেন্ট বিচার বা অভিযোগ আনে না; বিভিন্ন সংস্থা—যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার অনুরোধের ভিত্তিতে প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে তারা। গত বছরে প্রায় ২৭ হাজার পোস্ট বা লিংক অপসারণের অনুরোধ করা হলেও প্রায় ৬৩ শতাংশ ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়েছে।
এমদাদ উল বারী বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীনতাও অনলাইন সহিংসতা, প্রতারণা ও বিভ্রান্তি বাড়াতে পারে; তাই আইন, প্রযুক্তি ও সচেতনতার সমন্বিত উন্নয়ন জরুরি।
ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ‘নিয়ন্ত্রণ হবে কি না’—এই বিতর্ক এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়; বরং কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যাতে একটি অধিকার অন্যটিকে খর্ব না করে, সেটিই মূল বিষয় বলে উল্লেখ করেন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম।
শহিদুল আলম বলেন, কার্যকর সাইবার শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বাধীন তদারকি, তথ্য সুরক্ষা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি প্রশ্ন তোলেন—ক্ষতিকর ও অবৈধ কনটেন্ট কি একভাবে বিবেচিত হচ্ছে, আইন অপপ্রয়োগের শিকার হলে নাগরিকদের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কতটা রয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কতটা স্বাধীন।
এ ছাড়া সংলাপে বক্তব্য দেন ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন, নাগরিক কোয়ালিশনের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী, সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফসহ অনেকে।



