সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার জেরে সড়কে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে। স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থার কারণে চালকদের মধ্যে জরিমানা বা মামলার ভয়ও বেড়েছে। আর সেই ভয়কেই এবার অস্ত্র বানিয়েছে সাইবার প্রতারকরা।
ভুয়া জরিমানার এসএমএসে ফাঁদ
ভুয়া জরিমানার এসএমএস পাঠিয়ে সাধারণ গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। সরকারি নোটিশের আদলে পাঠানো এসব মেসেজে থাকে ভুয়া পেমেন্ট লিংক। অনেকেই যাচাই না করে লিংকে ক্লিক করছেন, আর মুহূর্তেই খালি হয়ে যাচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।
প্রতারকদের পরিকল্পিত কৌশল
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারকরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই প্রতারণা চালাচ্ছে। প্রথমে চালকদের মোবাইলে ট্রাফিক বিভাগের বার্তার মতো দেখতে একটি এসএমএস পাঠানো হয়। সেখানে উল্লেখ থাকে— নির্দিষ্ট কোনও সড়কে গাড়িটি গতিসীমা অতিক্রম করেছে বা ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে। এরপর বলা হয়, এআই ক্যামেরায় ধরা পড়ায় নির্দিষ্ট অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে।
মেসেজের সঙ্গে দেওয়া হয় একটি লিংক, যা দেখতে সরকারি ওয়েবসাইট বা অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মতো। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে সেগুলো ফিশিং বা ক্লোন সাইট। কোথাও .gov.bd-এর মতো ডোমেইন ব্যবহার করা হয়, কোথাও আবার bit.ly বা অন্য সংক্ষিপ্ত লিংকের মাধ্যমে ফাঁদ তৈরি করা হয়।
আতঙ্ক তৈরি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে
শুধু তাই নয়, চালকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতেও কৌশল নেয় প্রতারকরা। এসএমএসে বলা হয়— ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে অর্থদণ্ড দ্বিগুণ হবে। এমনকি, লাইসেন্স বাতিল বা আইনি ব্যবস্থারও হুমকি দেওয়া হয়। আতঙ্কে অনেকেই আর বিস্তারিত যাচাই করেন না।
এই প্রতারণার শিকার হয়ে শুধু জরিমানার টাকা নয়, অনেক ক্ষেত্রে পুরো ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা
প্রতারণার শিকার হওয়া মোটরসাইকেল চালক আসাদুল ইসলাম বলেন, “গত সপ্তাহে আমার মোবাইলে একটা মেসেজ আসে। সেখানে বলা হয়, প্রগতি সরণিতে আমার বাইক স্পিড লিমিট অতিক্রম করেছে। জরিমানা দেওয়ার জন্য একটি লিংক ছিল। আমি বিকাশ দিয়ে টাকা দিতে যাই। কিছুক্ষণ পর দেখি অ্যাকাউন্ট থেকে ১৫ হাজার টাকা উধাও।”
আবদুর রাকিব নামে এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ভিডিও বার্তায় জানান, তিনি বাইক না চালিয়েই এ ধরনের প্রচারণামূলক মেসেজ পেয়েছিলেন। প্রথমে তার কাছেও বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দিলে ডিসকাউন্টের কথাও বলা হয়। পরে বুঝতে পারেন এটা প্রতারকদের কাজ।
ওটিপি ও পিন চুরির লক্ষ্য
সাইবার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত ওটিপি ও পিন সংগ্রহ করাই প্রতারকদের প্রধান লক্ষ্য। ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার পর ব্যবহারকারীদের বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিতে বলা হয়। এরপর ওটিপি বা পিন ইনপুট করার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার পেয়ে যায় প্রতারক চক্র।
আসল ও ভুয়া নোটিশের পার্থক্য
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসল ও ভুয়া ট্রাফিক নোটিশের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সরকারি নোটিশ সাধারণত নির্ভরযোগ্য ডোমেইন থেকে আসে এবং সেখানে সরাসরি পিন বা ওটিপি চাওয়া হয় না। অন্যদিকে, প্রতারণামূলক লিংকে প্রায়ই বানান ভুল, অস্বাভাবিক ওয়েব ঠিকানা বা অতিরিক্ত ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিষয় দেখা যায়।
ডিএমপির সতর্কতা ও পরামর্শ
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা চালকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, কোনও জরিমানার মেসেজ পেলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে ট্রাফিক পুলিশের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে গিয়ে গাড়ির নম্বর দিয়ে তথ্য যাচাই করতে হবে। সন্দেহজনক কোনও লিংকে ক্লিক করা বা সেখানে আর্থিক তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা আরও বলেন, কোনও অবস্থাতেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন, কার্ডের সিভিভি নম্বর বা ওটিপি কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। প্রতারণামূলক কোনও মেসেজ পেলে সেটির স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করে নিকটস্থ থানা বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির পূর্ববর্তী সতর্কতা
গত ২৪ মে এ ধরনের প্রতারণা নিয়ে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি ট্রাফিক জরিমানার নামে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে নগরবাসীর কাছে ভুয়া বার্তা পাঠানো হচ্ছে। এসব এসএমএস সম্পূর্ণ বানোয়াট ও অসত্য।
ডিএমপির ভাষ্য অনুযায়ী, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ লঙ্ঘনের ঘটনায় এআই বা ভিডিও মামলার ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোনও যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হলে সংশ্লিষ্ট মালিকের ঠিকানায় ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। এছাড়া প্রয়োজনে শুধুমাত্র ০১৩২০-০৪২২০৭ এবং ০১৩২০-০৪২২২৭ নম্বর থেকে এসএমএস পাঠানো হয়ে থাকে বলেও জানানো হয়েছে।
ডিএমপি আরও জানায়, ট্রাফিক জরিমানার অর্থ কেবল অনুমোদিত অনলাইন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম— উপায় ও সিবিবিএলের মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়। কোনও অবস্থাতেই ট্রাফিক বিভাগ মোবাইল ব্যাংকিং পিন, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি জানতে চায় না।
ট্রাফিক এআই বা ভিডিও মামলা সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য জানতে ডেল্টা-৩ শাখা, ০১৩২০-০৪২২০৭, ০১৩২০-০৪২২২৭ নম্বর অথবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে ডিএমপি।



