নববর্ষে সিরাজগঞ্জের গামছার হাটে কর্মচাঞ্চল্য
বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জ জেলার গামছার হাটগুলোতে ব্যাপক কর্মব্যস্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেলার বিভিন্ন তাঁতপল্লীতে শ্রমিকরা এখন দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না, কারণ নববর্ষ উপলক্ষে গামছার বিশেষ চাহিদা তৈরি হয়েছে। সারা দেশ থেকে পাইকাররা সিরাজগঞ্জের হাটগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি এনেছে।
ঐতিহ্যবাহী হাটের গুরুত্ব
সিরাজগঞ্জ জেলায় তাঁতপণ্য কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে সোহাগপুর, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর ও সিরাজগঞ্জে একাধিক কাপড়ের হাট গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে যমুনা সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের পাঁচিলা এলাকায় দেশের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন গামছার হাটটি অবস্থিত। শতবর্ষী এই হাট আজও সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ও শুক্রবার উল্লাপাড়া উপজেলার এই হাটে বসে রঙের মেলা, যেখানে ভোর থেকেই বিভিন্ন রঙ ও নকশার গামছায় পুরো হাট ভরে ওঠে।
বেচাকেনার পরিসংখ্যান ও চাহিদা
প্রতি সপ্তাহে এই হাটে লাখ লাখ টাকার গামছা বেচাকেনা হয়। পাঁচিলা গ্রামের তাঁতশ্রমিক আব্দুস ছালাম বলেন, “নববর্ষ এলেই আমাদের কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এখন দিন-রাত তাঁত চালাতে হচ্ছে, কারণ বৈশাখে গামছার চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।” বেলকুচি এলাকার তাঁত মালিক আসাদুল মুন্সী জানান, নববর্ষকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই গামছার চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং এবারও উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে।
দাম বৃদ্ধি ও চ্যালেঞ্জ
তবে সুতা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ঢাকার পাইকার শাহ আলম ও নরসিংদীর সোলায়মান উল্লেখ করেন যে, তারা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই হাট থেকে গামছা কিনে সারা দেশে বিক্রি করছেন। নববর্ষকে ঘিরে এবার বাজারে চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়েছে; গত সপ্তাহে প্রতি থান (৪ পিস) গামছা ৩৫০ টাকায় কেনা গেলেও এবার তা ৪০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
শিল্পের ভবিষ্যৎ ও সরকারি সহায়তা
তাঁতশিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় গামছা বুনে তাঁতিরা ভালো লাভ করলেও এখন কাঁচামালের দাম বাড়ায় মুনাফা কমে গেছে। তাই ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বেলকুচি উপজেলা হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শ্রী বৈদ্যনাথ রায় বলেন, “নববর্ষকে ঘিরে সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লীতে যে কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়, তা স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্যকেও বাঁচিয়ে রাখে। যথাযথ সহায়তা পেলে এ শিল্প আরও বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
যোগাযোগ সুবিধা ও অর্থনৈতিক প্রভাব
মহাসড়কের পাশে অবস্থান হওয়ায় সহজ যোগাযোগের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা সহজেই এই হাটে আসতে পারছেন, যা তাঁত মালিকদের দ্রুত পণ্য বিক্রি করতে সাহায্য করছে। এই কর্মব্যস্ততা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং গ্রামীণ জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে।



