পুঁজিবাজারে স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু, সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবগঠিত কমিশন।
দায়িত্ব গ্রহণ ও সংবাদ সম্মেলন
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) নিয়োগ পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আগারগাঁওয়ে বিএসইসির প্রধান কার্যালয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান। এরপর তিনি সংবাদ সম্মেলনে নতুন কমিশনের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং নবনিযুক্ত কমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন।
স্মার্ট ও ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ
সংবাদ সম্মেলনে মাসুদ খান বলেন, “আমরা বাজারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে চাই। যেখানে প্রয়োজন সেখানে কঠোর ও স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে, আবার যেখানে সম্ভব সেখানে নিয়ন্ত্রণ সহজ করা হবে। ধীরে ধীরে পুরো পুঁজিবাজারকে প্রযুক্তিনির্ভর ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা হবে।” তিনি আরও বলেন, নতুন কমিশনের লক্ষ্য হবে এমন একটি আধুনিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেবাদান হবে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং অংশীজনবান্ধব।
কারসাজিকারীদের জন্য কঠোর বার্তা
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই বাজার কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে কারসাজিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘রিয়েল টাইম’ বা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের। তিনি আরও জানান, কারসাজি প্রতিরোধে বিশেষ করে জেড ক্যাটাগরিভুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর শুরু থেকেই নিবিড় নজরদারি থাকবে। কমিশনের সব কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও সুরক্ষা।
কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়
নতুন চেয়ারম্যান স্পষ্টভাবে জানান, শেয়ারের দাম নিয়ন্ত্রণ বা বাজারের উত্থান-পতন ঠেকাতে কোনও কৃত্রিম ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে নয় নতুন কমিশন। বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে শেয়ারের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত করাই হবে বিএসইসির লক্ষ্য। তিনি বলেন, “বাজারকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিতে হবে। তবে অনিয়ম, কারসাজি বা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির কারণ হতে পারে—এমন যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।”
নতুন কমিশনের অগ্রাধিকার
প্রায় আধা ঘণ্টার বক্তব্যে নতুন চেয়ারম্যান তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের মূল দর্শন ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, নতুন কমিশনের প্রধান অগ্রাধিকার হবে:
- স্মার্ট ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা
- পুঁজিবাজারের ডিজিটালাইজেশন
- ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বৃদ্ধি
- সরাসরি তালিকাভুক্তি (ডাইরেক্ট লিস্টিং) ব্যবস্থার নতুন কাঠামো প্রণয়ন
- প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো
- বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ
- বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা
নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিএসইসির চেয়ারম্যান ও তিন কমিশনার নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান ক্রাউন সিমেন্টের গ্রুপ সিইও মাসুদ খান। কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন নাহিদ মাহতাব, তানভীর হাবিব রহমান এবং নাফিজ আল তারিক। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক ত্যাগের শর্তে তাঁদের চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সকালে পদত্যাগ, বিকেলে নতুন কমিশন
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করে। পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন কমিশন গঠনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ফলে একই দিনে বিএসইসিতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের পুঁজিবাজার নতুন কমিশনের অধীনে যাত্রা শুরু করল। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন কমিশনের ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের নানা সংকট কাটিয়ে পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।



