পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে বিশেষ সড়কবাতি ব্যবহারে দেখা মেলে আলোর রোশনাই। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন সড়কে জ্বলে ওঠা সড়কবাতিতে নগরীর সৌন্দর্য যেন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। পাখির চোখে তা দেখে মুগ্ধ হবেন যে কেউ।
নান্দনিক সড়কবাতির ইতিহাস
স্থানীয়রা জানান, রাজশাহী নগরীতে সন্ধ্যা নামতেই প্রধান সড়কগুলো আলোকিত হয় দৃষ্টিনন্দন রাজমুকুট, প্রজাপতি ও ফ্লাড লাইটের আদলে তৈরি সড়কবাতিতে। ২০১৯ সালে থাইল্যান্ড ও চীন থেকে আনা নানা ডিজাইনের লাইটগুলো জ্বলে উঠতেই নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়।
নগরবাসীর অভিযোগ, তালাইমারি থেকে কোর্ট চত্বর পর্যন্ত প্রতিটি খুঁটিতে রাজমুকুটের আদলে ১৩টি করে ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় লাইট স্থাপন করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সড়কে পর্যাপ্ত আলো থাকছে না, অন্যদিকে নিম্নমানের লাইট ব্যবহারের ফলে মাঝেমধ্যে তা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাড়ছে ভোগান্তি।
প্রকল্পের ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণ
রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা-বন্ধগেট, তালাইমারী-কোর্ট, তালাইমারী-কাটাখালী ও আলিফ-লাম-মীম ভাটার মোড় থেকে বিহাস পর্যন্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটার পথে আছে আধুনিক এসব সড়ক বাতি। আলোর তীব্রতা বিশ্লেষণ করে প্রায় ১৫ মিটার দূরত্বে বসানো হয় এসব বাতি। নান্দনিক এসব সড়কবাতি আনা হয় তুরস্ক, চীন ও ইতালি থেকে। নগরীর ১৮টি পয়েন্টে উঁচু উঁচু ফ্লাডলাইটও বসানো হয়েছে বিদেশ থেকে এনে। ১০৩ কোটি ৭ লাখ টাকার নান্দনিক বাতির অনেকগুলোই নষ্ট হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ের আগে। প্রতিদিনই রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে সচল রাখা হচ্ছে এগুলো।
প্রজাপতি সড়কের করুণ অবস্থা
প্রশস্ত সড়ক, প্রজাপতি বাতি। দুইয়ে মিলে দৃষ্টিনন্দন হওয়ায় ভিন্নমাত্রা পেয়েছিল রাজশাহী নগরীর বিলসিমলা-কাশিয়াডাঙ্গা সড়কটি। বর্তমানে সেই সড়কে দুটি ওভারপাস নির্মাণের কাজ চলায় বড় বড় গর্ত করে চলছে কর্মযজ্ঞ। প্রজাপতি বাতির অর্ধেকই করা হয়েছে অপসারণ। এভাবে নগরীতে ৫টি রেলক্রসিংয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণ করছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন।
নগরবিদদের ভাষ্য, মহাপরিকল্পনা করে একসঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলে কমতো অর্থের অপচয়। দিনে প্রশস্ত সড়কে প্রশান্তির চলাচল। রাতে প্রজাপতি সড়কবাতির ঝলমলে আলো। এতে ২০২১ সালে ভিন্নমাত্রা পায় রাজশাহী নগরীর বিলসিমলা-কাশিয়াডাঙ্গা সড়কটি। সেসময় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭৪টি পোলে ৩৪৮টি এলইডি বাল্ব লাগায় রাসিক কর্তৃপক্ষ। সড়ক বাতির ওপরের অংশে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে থাকা দুই পাশে দুটি করে এলইডি বাতির কারণেই এটি ‘প্রজাপতি সড়ক’ নামে পরিচিতি পায়। উদ্বোধনের ৪৯ দিনের মাথায় ঝড়ে ৮৫টি পোল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং তা মেরামত করে। এখন এই সড়কটির নতুন বিলসিমলা ও হড়গ্রাম নতুন পাড়ায় রেলক্রসিংয়ে নির্মিত হচ্ছে ফ্লাইওভার। আর এ কারণে ভেঙে ফেলা হয়েছে সড়কের ডিভাইডার, বসানো হচ্ছে পাইল। খুলে নেওয়া হয়েছে ৬৭টি বাতি।
স্থানীয়রা বলছেন, রাজশাহী নগরীর আইকনিক হয়ে ওঠা সড়কটির সেই চেহারা এখন আর নেই। কয়েক বছর যেতে না যেতেই সড়কটি চেহারা পাল্টেছে। সড়কটির বিলসিমলা এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণ করছে ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’। আর হড়গ্রাম এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণ করছে ‘ডিয়েনকো লিমিটেড’। নগরীর বন্ধ গেট, শহীদ কামারুজ্জামান চত্বরে আরও ৩টি রেলক্রসিংয়ে হচ্ছে ফ্লাইওভার।
সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব
রুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, ‘এখানে মূল সমস্যা সমন্বিত পরিকল্পনা। মহাপরিকল্পনা করে সড়ক, সড়ক বাতি এবং ওভারপাস নির্মিত হলে কমতো টাকার অপচয় ও নাগরিক ভোগান্তি।’
ফ্রান্স সফর বাতিল
এদিকে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী সড়কবাতি দেখতে ফ্রান্সে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান। তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সফর বাতিল করায় তা আর হচ্ছে না।
জানা গেছে, রাজশাহী নগরীতে চীন ও পোল্যান্ডে উৎপাদিত সড়কবাতি লাগানো হয়েছে। এবার ‘সিগনিফাই বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠান তাদের ‘ডিসপ্লে সিটি’ দেখাতে সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমতি ও ভিসা পেলে আগামী ২০ বা ২১ জুন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান ওরফে রিটন ও নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) এ বি এম আসাদুজ্জামান ফ্রান্সে যাওয়ার কথা ছিল। এটি প্রায় ১০ দিনের সফর। এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম গত ১২ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তাতে বলা হয়, সিগনিফাই বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও প্রকৌশলীকে ফ্রান্স নিয়ে যাবে। ওই দুই জন সিগনিফাই ফ্রান্সের আউটডোর লাইটিং অ্যাপ্লিকেশন (ওলাক) সেন্টার পরিদর্শন করবেন। সেখানে সড়কবাতির নতুন বিদ্যুৎসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ওপর জ্ঞান আহরণ করবেন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘ফ্রান্সে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী সড়কবাতি দেখতে যাওয়ার জন্য কোম্পানির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর সঙ্গে বাতি কেনার কোনও সম্পর্ক নেই। যাওয়ার বিষয়টি এখন নিশ্চিত নয়; কারণ, স্থানীয় সরকারের অনুমতি পেলেই যেতে পারতাম। কিন্তু অনুমতি পাওয়া যায়নি।’
সিগনিফাই বাংলাদেশ লিমিটেড সূত্রে জানা যায়, ৫৫টি দেশে তাদের কারখানা রয়েছে। কোম্পানির বয়স ১৩৫ বছর। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় দফায় যেসব সড়ক বাতি লাগানো হয়েছে, তার সবই তাদের কোম্পানির। এগুলো পোল্যান্ডে তৈরি। ফ্রান্সে তাদের একটি ডিসপ্লে সিটি রয়েছে। রাজশাহী একটি লাইটিং সিটি। তাই তারা রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে কোম্পানির পক্ষ থেকে ফ্রান্সের সিটি দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। পছন্দ হলে তারা তাদের পরিবেশকের কাছ থেকে বাতি কিনবেন।
প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার আবদুল গাফফার বলেন, ‘এখন আরও নতুন প্রযুক্তি এসেছে। বাতিগুলো আগের চেয়ে আরও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী হবে। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বাতি নেওয়া হলে রাজশাহী শহরে আগে যে বাতিগুলো লাগানো আছে, সেগুলোকেও আরও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী করে দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভিসার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত ছিল না। ভিসা পেলে আগামী ২০ অথবা ২১ জুলাই যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সফর বাতিল করা হয়।’
সিটি করপোরেশনের ব্যাখ্যা
গত ২ জুন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ দফতর থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘‘সড়কবাতি নিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে ফ্রান্সে যাচ্ছেন রাসিক প্রশাসক’’ শিরোনামে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়, তা আংশিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে প্রচারিত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য রাজশাহীবাসীর অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, সিগনিফাই বাংলাদেশ লিমিটেড বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ও আধুনিক নগর আলোকায়ন প্রযুক্তি বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে ফ্রান্স সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এই সম্ভাব্য সফরের যাবতীয় ব্যয়ভার আমন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বহন করার প্রস্তাব করেছিল এবং এ সফরের জন্য রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কোনও অর্থ ব্যয়ের প্রশ্নই ছিল না।
তিনি আরও বলেন, ‘আমন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কোনো চলমান বা পূর্ববর্তী উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সম্ভাব্য সফর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদনপত্র প্রেরণ করা হয়েছিল মাত্র। সরকার কর্তৃক কোনও অনুমোদন বা সরকারি আদেশ (জিও) জারি হয়নি। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে উক্ত সফরসহ এ ধরনের সব বিদেশ সফর আপাতত বাতিল করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট সফরটি বাস্তবায়নের কোনও সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। অতএব, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ফ্রান্স সফরে যাচ্ছেন, এমন নিশ্চিত তথ্য প্রচার করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার জনমনে ভুল ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। রাজশাহী মহানগরবাসীকে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।’
সোলার বাতির দাবি
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে রাজশাহীতে কাজ করেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাম্পেইন অ্যাসোসিয়েট’ -এর রনি রায়। তিনি জানান, রাজশাহী শহর সড়ক বাতির জন্য সমাদৃত, যা রাজশাহী শহরের সৌন্দর্য্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই সড়ক বাতিতে অনেক বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়, যা বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। এর একটি সুন্দর সমাধান হতে পারে সোলার ভিত্তিক সড়ক বাতি, যা পরিবেশ বান্ধব এবং নবায়নযোগ্য। রাজশাহী শহরের সড়ক বাতিগুলোতে যদি সোলার বেজ করা যায়, তাহলে একদিকে যেমন বিদ্যুতের উপর চাপ কমবে, অন্যদিকে রাজশাহী শহর সবুজ নগরীতে পরিচিতি পাবে। বর্তমানে এই জ্বালানি সংকটে জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহী শহরের সব সড়ক বাতি সোলার ভিত্তিক করার দাবি জানাচ্ছি।



